নিউইয়র্কে এস্ক্লুসিভ সাক্ষাতকারে সঞ্জীব চৌধুরী : আমাকে মেরে ফেললেও বলবো ইলিয়াস আলীকে খুন করেছে সরকারের একটি এজেন্সি : সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক, কিন্তু আমাদের বিবেকতো মালিকের কাছে বন্ধক রেখে দিয়েছি চাকরীর প্রথম দিন থেকেই
নিউইয়র্ক থেকে এনা : আমার দেশ পত্রিকার সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের পোড় খাওয়া সাংবাদিক সঞ্জীব চৈাধুরী বলেছেন, আমাকে মেরে ফেললেও বলবো ইলিয়াস আলীকে খুন করেছে সরকারেরই একটি এজেন্সি। প্রথমে অপহরণ করে গুম করে, পরে খুন করে লাশ নিশ্চিহ্ন করে দেয়। সঞ্জীব চৌধুরী আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন নিউইয়র্কে ২৩ ও ২৪ জুন অনুষ্ঠিত এবিসি কনভেনশনে। এ সময় তাঁর একটি এস্ক্লুসিভ সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হয় বহির্বিশ্বে সর্বাধক প্রচারিত বাংলা সংবাদপত্র ঠিকানা’র পক্ষ থেকে। সাক্ষাৎকারটি চলতি সংখ্যা ঠিকানায় ছাপা হয়েছে। সেখানে বলেছেন অনেক না জানা কথা। এখানে প্রশ্নোত্তর আকারে হুবহু তার সাক্ষাতকারটি উপস্থাপন করা হলো হলো।
ঠিকানা : আমেরিকায় প্রথম সফর, কেমন অভিজ্ঞতা হলো?
উত্তর : মজার মজার সব অভিজ্ঞতা। এদিকে গেলে বলে, এরাতো আওয়ামী লীগ পন্থী-ওদিকে গেলে বলে, ওরাতো বিএনপি পন্থী। এই যে সৈয়দ শামসুল হক আর ফরহাদ মজহারকে এবিসি কনভেনশনে আপনারা একই মঞ্চে পাশাপাশি বসালেন, এটা ঢাকায়ও কঠিন। আপনারা পেরেছেন। এটাও একটা অভিজ্ঞতা। ঢাকা থেকে আসার সময় আমি ভয়ে ভয়ে ছিলাম। অনেকেই বলেছিলেন, বিমানবন্দরে খামোকা নাকি হেরাসমেন্টের শিকার হতে হয়। কিন্তু আমার মনে হয় আমি ভাগ্যবান। কোন ধরনের বাধার সম্মুখীন আমি হইনি কোথাও। বরং সব জায়গায় আমি ন্যায্য ব্যবহার পেয়েছি। আরেকটি ব্যাপারে ঢাকায় বলা হয়েছিল যে, নিউইয়র্কে হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের কারণে নাকি আকাশ দেখা যায় না। দম বন্ধ হয়ে আসে। আমার কাছে মনে হয়েছে, এসব সত্যি নয়। হাইরাইজ কোথাও কোথাও থাকতে পারে, তবে দম বন্ধের কথাতো ডাহা মিথ্যা। বরং এখানে এসে আমার ইনহেলার ব্যবহার করতে হয়নি।
ঠিকানা : ঢাকার মিডিয়ায় আপনার বিচরণ অনেক দিনের। নিউইয়র্কের বাংলা মিডিয়া দেখলেন, কেমন লাগলো ?
উত্তর : এখানকার বাংলা মিডিয়ার বিকাশ দেখে আমরা আশ্বস্ত হই। এতগুলো পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে দেখে আমরা শিহরিত হই। আবার সবগুলো পত্রিকা যে মান বজায় রাখতে পারছে না, সেটা আবার হতাশাও জাগায়। তবে মনে হয় এভাবে চলতে চলতে এক সময় হতাশা সবাই কাটিয়ে উঠবে। ইতিমধ্যেই ঠিকানা গ্রæপ সেই হতাশা কাটিয়ে উঠে প্রত্যাশার পুরোটাই প্রায় পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমি এখানে অনেকের ঘরেই গিয়েছি। দেখেছি তারা ঠিকানার নিয়মিত গ্রাহক। ঠিকানা যে প্রফেশনালী পত্রিকাটা চালাবার চেষ্টা করছে এবং চেষ্টা করে সফলও হয়েছে। কারণ সফল না হলেতো এতবড় কনভেনশন (এবিসি) আয়োজনও সম্ভব হতো না। আর কোন পত্রিকা অফিসে আমি যাইনি। তাদের ভেতরের খবর আমি বলতে পারবো না। এখানকার পত্রিকাকে অনেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, আবার অনেকে ঠাট্টা মশকরাও করেন। এই ঠাট্টা মশকরা অগ্রাহ্য করেই এগিয়ে যেতে হবে।
ঠিকানা : কেউ বলে ঠিকানা আওয়ামী পন্থী, কেউ বলে বিএনপি পন্থী, আবার অনেকেই বলেন মিডল পন্থী- নিউইয়র্কে কয়েক সপ্তাহ ঠিকানা পড়ে আপনার কী মনে হয়েছে?
উত্তর : আমার মনে হয়েছে, ঠিকানা যে প্রফেশনাল বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারছে- ঢাকার অনেক পত্রিকাও সেটা পারছে না। ঢাকায় এক এক পত্রিকার এক এক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পাঠকরা বিব্রত হয়। কিন্তু ঠিকানার নিউজে কমেন্ট বাদ দিয়ে নিরেট তথ্যটা তুলে ধরা হয়। তাতে কেউ অসন্তুষ্ট হউক বা সন্তুষ্ট হউক, ঠিকানার কিছু যায় আসে না। এই মনোভাবটাই কিন্তু সাংবাদিকতার বেসিক হওয়া উচিত।
আরেকটি জিনিস আমার খুব ভাল লেগেছে ঠিকানার সাংবাদিকদের লো-প্রফাইল মেনে চলার প্রবণতা। আমরা যখন ছোট বেলায় সাংবাদিকতায় ঢুকি, তখন আমাদের গুরুরা বলতেন- দেখ স্মার্টনেস থাকবে তোমার কলমের ডগায়। তুমি যদি ১০ জনের সঙ্গে এক জায়গায় যাও, সবাই যেন মনে করে তুমি ১০ ন¤^র ব্যক্তি। তুমি যদি বুক টান টান করে বল, তুমি কী জান আমি কে? তখন কি তোমার সোর্স তোমাকে কিছু খুলে বলবে ?
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। ভাল হউক, মন্দ হউক- লোকে সমালোচনা করুক আর প্রশংসা করুক- ঠিকানা পত্রিকা উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশী সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখন ঠিকানার দায়িত্ব এটাকে চালু রাখা, এটাকে আরো উজ্জ্বল করা।
ঠিকানা : দেশের সাংবাদিকতা কেমন চলছে ?
উত্তর : ১৯৭০-এ সাংবাদিকতা শুরু আমার। সেই সময়ের সাথে আজকের তুলনা করা যায় না। সর্বত্র আমূল পরিবর্তন। সেই সময়ে সাংবাদিকরা গরীব ছিল। জীবন যাত্রা অনিশ্চিত ছিল । কিন্তু সাংবাদিকদের একটা সম্মান ছিল সমাজে। বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে অনেক লোভনীয়, অনেক নিরাপদ। কিন্ত সম্মান নেই। কেন জানি মনে হয় লোকজন সাংবাদিকদের এখন আর শ্রদ্ধা করে না। আগে আমরা সাংবাদিকরা আড্ডা দিতাম ঘরোয়া মেজাজে। কিন্তু এখনকার আড্ডা কেমন জানি প্রফেশনাল হয়ে গেছে। এখন হয়তো আমরা পরস্পরের সহকর্মী হলেও বন্ধু কিনা বলাটা কঠিন।
ঠিকানা : কেন এমন হলো?
উত্তর : এর কোন ব্যাখ্যা বা উত্তর নেই। অবশ্য একটা ব্যাখ্যা হতে পারে এরকম- ব্রিটিশ আমলে পত্রিকা হতো ব্যবসার জন্য নয়, পত্রিকা হতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে। যেমন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে চাঙ্গা করতে, পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের ইনটিগ্রিটি রক্ষায়। মানে কোন না কোন আদর্শ বা লক্ষ্যকে সামনে রেখেই পত্রিকা প্রকাশ হতো। মানিক মিয়া বলতেন, রাজনীতি বর্জিত নিউজ পেপার আর টয়লেট পেপার একই জিনিষ। কিন্তু এখন পত্রিকা বের হচ্ছে ব্যবসা করার জন্য।
ঠিকানা : এখন মানে কী স্বাধীনতার পর থেকে?
উত্তর : না, স্বাধীনতার পর নয়। ৮০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে পত্রিকায় রোজগারের বিষয়টিই মূখ্য হয়ে উঠে। সেই সময়ে সরকারের ৩ প্রতিষ্ঠান টাইমস, অবজারভার ও দৈনিক বাংলায় দেশের নমস্য অনেক সাংবাদিক কাজ করতেন। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে আয় ব্যয় কোন বিষয় ছিল না। সরকার খরচ দিত। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংবাদিকরা নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে যতটুকু সচেতন ছিলেন, নিজ দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে ততটুকু নিষ্ঠাবান ছিলেন বলে মনে হয়নি আমার কাছে। কেউ কেউ হয়তো ছিলেন, কিন্তু বাকী সবাই ছিলেন পাওনার ব্যাপারে সচেতন। ঐ সময় সরকারী পত্রিকার পাশাপাশি ইত্তেফাকের অবস্থাটা ছিলো রমরমা। প্রচার সংখ্যা বাড়ছেই। সরকারী ৩ পত্রিকা ও ইত্তেফাক মিলে এমন একটা সিন্ডেকেট গড়ে তুলেছিল, যেন বাজারের অন্য কোন পত্রিকা আর্থিকভাবে লাভবান হতে না পারে। তারাই তখন হকারদের জন্য ৪০ শতাংশ কমিশন চালু করলো। ইত্তেফাক মনে করলো হকারদের দিয়ে প্রচার সংখ্যা না বাড়লেও অসুবিধা নেই। বিজ্ঞাপনের জন্য লাইনতো লেগেই আছে। বিজ্ঞাপনের লাভ দিয়েই চলবে। এতে করে পত্রিকা অফিসগুলোর ভারসাম্য কিছুটা ক্ষুন্নু হয়। এভাবে যেতে যেতে আজকের কাগজ যখন পত্রিকা হিসেবে বের হলো, তখন কর্তৃপক্ষ পত্রিকায় কিছুটা তারুণ্যের মেজাজ রাখার চেষ্টা করলো, আসম্প্রদায়িক চেতনাকে সামনে রাখার চেষ্টা করলো। এতসব চেষ্টার পরও কর্তৃপ দেখলো, তারা ব্যবসায়িকভাবে মার যাচ্ছে। তারপর আজকের কাগজে বিদ্রোহ হলো। একগ্রুপ বেরিয়ে এসে ভোরের কাগজ বের করলো। এই প্রথম পত্রিকা মালিকানায় করপোরেট হাউস যুক্ত হলো। সেই সময়ে সাবের হোসেন চৌধুরী উদ্যোগী হলেন ভোরের কাগজের প্রকাশনায়। এর কিছুদিন পর গ্লোব কোম্পানী প্রকাশ করলো জনকন্ঠ। তারা একটা বুদ্ধি করলো। সিদ্ধান্ত নিল এইটা বিএনপি পন্থী কাগজ হবে, তবে বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করা যাবে না। এর মধ্যে প্রবীণ সাংবাদিক শামসুদ্দিন ভাই জনকন্ঠে তসলিমা নাসরীন ইস্যুতে একটা লেখা লিখলেন। প্রতিবাদে মৌলানারা মিছিল বের করলো, পত্রিকা অফিসে ঢিল ছুঁড়লো এবং তোয়াব ভাই সহ অনেককেই এরেস্ট করা হলো। তখন জনকন্ঠ স্ট্র্যাটেজী বদলালো। হয়ে উঠলো মৌলবাদ বিরোধী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। তারা এ স্ট্রাটেজিতে সফল হলো। তখন তারা মনে করলো, আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে ব্যালেন্স করার চেয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ নিলেইতো বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। ঠিক ঐ সময় ভাইয়ে ভাইয়ে গ্যাঞ্জামে ইত্তেফাক ৪১ দিন বন্ধ ছিল। এই সুযোগে জনকণ্ঠ তর তর করে এগিয়ে গেল।
আরো আগে যখন বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন, তখন পত্র-পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর ছবি ছাপানো, বঙ্গবন্ধুর পে কোনো কিছু লেখা অলিখিতভাবে নিষেধ ছিলো। যদিও সরকারী কোন নিষেধাজ্ঞা ছিলো না। ঐ সময় মিজানুর রহমান মিজান সাপ্তাহিক খবর বলে একটা পত্রিকা বের করলেন। উনি সেই পত্রিকায় অকথ্য ভাষায় আওয়ামী লীগকে গালাগালি করে লেখালেখি করতেন। যদিও সেই পত্রিকা কেউ কিনতো না। যখন পত্রিকাটির ষষ্ঠ সংখ্যা বের হবে, সেই সময়ে ছাত্রলীগ একটা সম্মেলন আয়োজন করলো। তারা মিজানুর রহমান মিজানকে বললো, আমাদের সম্মেলনের খবরটা যদি আপনি ভালো করে বঙ্গবন্ধুর ছবি দিয়ে ছাপান, তাহলে আমরা ২ হাজার কপি পত্রিকা কিনে নেব।
পত্রিকা এমনিতেই চলতো না, অফিসেই পত্রিকা বিছিয়ে ঘুমাতেন। এরকম প্রস্তাবে সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলেন মিজানুর রহমান মিজান। ছাপার পর দেখা গেল পত্রিকাগুলো মুহুর্তের মধ্যেই বিক্রি হয়ে গেল। কারণ ঐ সময়ে আওয়ামী লীগ পন্থীদের মধ্যে একটা হাহাকার ছিল যে, আমাদের খবর কেউ ছাপে না। এক সপ্তাহের মধ্যে খবরের ঐ সংখ্যাটি কয়েকবার রি-প্রিন্ট পর্যন্ত করতে হয়েছিলো। ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়ে মিজানুর রহমান ঐ সময়ে প্রথম যে কাজটি করেছিলেন তা হলো, খবরের আগের ৫টি প্রকাশিত সংখ্যা সের দরে বিক্রিও করলেন না, ডাইরেক্ট পুড়িয়ে ফেললেন। কেননা উনি আওয়ামী লীগ বা বঙ্গবন্ধুকে যে গালাগালি করেছেন, সেটা যাতে প্রকাশ না হয়, যাতে কোন রেকর্ড না থাকে। এরপর ৭ম সংখ্যা থেকে খবর হয়ে যায় শতভাগ আওয়ামী লীগপন্থী পত্রিকা। এটা কিন্তু উনি আওয়ামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য করেননি, করেছেন ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে। এভাবেই যখন ব্যবসা হতে শুরু হলো, এক সময় করপোরেট হাউসগুলো দৈনিক পত্রিকার মালিক হতে শুরু করলো, আরো গ্ল্যামার নিয়ে ইলেকট্রনি· মিডিয়া আসলো, তখন থেকেই বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতের বিবর্তন শুরু।
সংবাদপত্র জগতে একটা এলোমেলো হাওয়া এখনো চলছেই। ঢাকার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এখনো স্থিরতা আসেনি। ধরুন, আমরা ৫ বন্ধু এক পত্রিকায় এক সাথে কাজ করছি। হঠাৎ একদিন দেখা গেল, ওয়েজ বোর্ডকে কোন পাত্তা না দিয়ে আকর্ষণীয় বেতন ও সুযোগ-সুবিধার প্রস্তাব আমাকে দেয়া হলো। আমি নামকাওয়াস্তে একটা দরখাস্ত দিয়ে পরদিন থেকে উধাও। চলে গেলাম নতুন জায়গায়।
আমরা সাংবাদিকরা আগে সমাজের উপরের স্তরের লোকদের সাথে সারাদিন উঠাবসা করে রাতে থাকতাম কুড়েঘরে। সন্তুষ্ট ছিলাম। এখন উপর তলার লোকদের সাথে ওঠাবাসা করে, আমরাও প্রলুব্ধ হচ্ছি। আমারও কিছু চাই। বেড়ে যায় চাহিদা। নীতির প্রশ্নে অনেক সময় অটল থাকতে পারি না। বর্তমানের পরিস্থিতি অনেকটা এরকমই।
ঠিকানা : এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কী কোন উপায় আছে?
উত্তর : উত্তরণের উপায় আমাদের নে·ট জেনারেশনই। তারা এ অবস্থার জন্য যতটা না দায়ী, বেশি দায়ী আমরা নিজেরাই। আমরা আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে বেয়াদপ বানাচ্ছি, মিথ্যা বলা শিখিয়েছি, আমরাই চুরি-চামারি করে তাদের বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত করেছি। আমরা যতই ভুল করি না কেন, সব কিছু তারাই এক সময় শুধরে নেবে। নিউ-জেনারেশন আসবে, তারা আরো স্মার্ট হবে। দেশপ্রেম থাকবে আরো বেশি।
ঠিকানা : আপনি বলছেন, আপনাদের পরের জেনারেশনের সংবাদিকদের নীতি নেই, নীতিহীন তারা। তাহলে নতুনরা শিখবে কার কাছ থেকে।
উত্তর : সবার মধ্যে যে নীতি নেই, ঠিক নয়।
ঠিকানা : আপনার কী মনে হয় পত্রিকা মালিক, সম্পাদক বা সরকারের কারণে আজকাল সাংবাদিকদের অনেক েেত্র নীতিহীন বলা হয়?
উত্তর : সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে সচরাচর আমরা যা বুঝি, তা হয়ে গেছে মূলত মালিকের স্বাধীনতা। মালিক যদি বলে আমরা সরকারের কথা শুনব না, আপনারা লিখেন, তখন আমরা সাহসী সাংবাদিক হয়ে যাই। মালিক যদি বলে খবরদার এটা লিখবেন না, তখন আমরা সাবমিসিভ হয়ে যাই। সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক। কিন্তু আমাদের বিবেকতো মালিকের কাছে বন্ধক রেখে দিয়েছি চাকরীর প্রথম দিন থেকেই।
ঠিকানা : আগের পত্রিকা এবং বর্তমানের পত্রিকার মধ্যে কী পার্থক্য, আপনার দৃষ্টিতে?
উত্তর : আগের পত্রিকার মালিকরা দৈনন্দিন পত্রিকায় হ¯—পে করতেন না এবং নিজ বা নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থে পত্রিকাকে ব্যবহার করার কথা চিন্তাই করতেন না। এখনকার মালিকা তা করেন। আরেকটি পার্থক্য হলো, বর্তমান সময়ে নিউজ এডিটর হলেন একজন কেরানী আর সম্পাদক হলেন একজন ম্যানেজার। যার দায়িত্ব হলো এখানে-ওখানে ফোন করে সব ঠিক-ঠাক রাখা। যা আগেকার পত্রিকায় ছিলোনা।
ঠিকানা : অনেক সময় দেখা যায়, সাংবাদিকরাই অমুক দলের তমুক দলের হিসেবে পরিচয় দেন এবং তাদের লেখায়ও তা প্রকাশ পায়। বর্তমান সময়ে এটা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে মিডিয়া জগতে। বিষয়টাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
উত্তর : বর্তমান সময়ে আমাদের সাংবাদিকদের মধ্যে সাংবাদিকতার কমিটমেন্টের চেয়ে রাজনৈতিক কমিটমেন্টের মূল্যায়ন গুর“ত্ব পাচ্ছে।।
ঠিকানা : কী কারণে?
উত্তর : ৭৫’-এ বাকশাল হলো। পরবর্তীতে শহীদ জিয়াউর রহমানের নির্দেশে সব রাজনৈতিক দল তাদের তৎপরতা শুরু করলো। তখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা গুণগত পরিবর্তন দেখা গেল। সেটা হলো, সব দলের রাজনৈতিক অঙ্গ-সংগঠন গড়ে তোলার প্রবণতা। আগের দিনতো ছাত্রলীগ ছিলো আওয়ামী লীগের সমর্থক একটা ছাত্র সংগঠন। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছিলো না। ঠিক একইভাবে শ্রমিকলীগ বা শ্রমিক সংগঠন দলের অঙ্গ ছিলো না। এ গুলোর সাথে রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ ছিল। এক একটা সংগঠন এক এক দলকে সাপোর্ট করতো। একটাকে সাপোর্ট করতে গিয়ে অন্যটার বিরোধিতা করতো। সাংবাদিকরাও রাজনৈতিক দলের সাপোর্ট করতো, বিরোধিতাও করতো। ধীরে ধীরে যখন অন্য পেশাজীবীরাও রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্য সাপোর্ট দিতে শুরু করলো, রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন হতে শুরু করলো, তখন সাংবাদিকরাও এ রোগ থেকে রেহাই পেল না। এখন গোটা দেশই দু’ভাগে বিভক্ত।
আমি সঞ্জীব চৌধুরীকে সাঈদ-উর-রব তাঁর প্রোগ্রামে দাওয়াত করে নিউইয়র্কে আনলেন। প্রোগ্রাম শেষে আমি রতন বড়ুয়ার বাসায় উঠলাম। এটা নিয়ে নিউইয়র্কে যে কী তোলপাড়। তা বুঝাতে পারবো না।
ঠিকানা : কেন?
উত্তর : তারা মনে করেন, সাঈদ-উর-রব আর রতন বড়ুয়া দুজন দুই মের“র লোক। আমাকে যারা বলেছেন, সরাসরি বলেছেন।
ঠিকানা : রতনদা কি বলেছেন?
উত্তর : রতনদা শুধু হাসেন।
ঠিকানা : কে, কী বলেছেন?
উত্তর : সেটা লেখার দরকার নেই। এ ধরনের কথাও বলছে যে, আমি বিএনপি পন্থী বলেই সাঈদ-উর-রব আমাকে দাওয়াত করেছেন। কিন্তু দেখুন, সৈয়দ শামসুল হকতো বিএনপির চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করেন। তাহলে সৈয়দ শামসুল হককে কেন সাঈদ-উর-রব দাওয়াত করলেন। এটার কিন্তু কোন ব্যাখ্যা নেই। সঞ্জীব চৌধুরী বিএনপির পত্রিকায় কাজ করেন, সাঈদ-উর-রব দাওয়াত করতেই পারেন কিন্তু আবার রতন বড়ুয়ার বাসায় উঠলেন, হিসাবই মেলাতে পারছেন না অনেকেই। এও বলেছেন অনেকে, তাহলে কী আপনি আওয়ামী লীগের দিকে যাচ্ছেন নাকি রতন বড়ুয়া বিএনপি’র দিকে ঝুঁকছেন? এ ধরনের বাচালতা বা এ ধরনের সংকীর্ণতারতো কোন প্রয়োজন নেই। আমেরিকার মতো মুক্তচিন্তার দেশে বাস করেও আমরা কিছুই শেখার চেষ্টা করি না।
ঠিকানা : নিউইয়র্কের বাইরে কোথাও গিয়েছিলেন?
উত্তর : কয়েকটি স্টেটে গিয়েছি
ঠিকানা : কেমন অভিজ্ঞতা হলো?
উত্তর : দুইটা অভিজ্ঞতা আমার খুব ভালো লাগলো। আমি যখন বস্টনে গেলাম তখন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা আলাদা আলাদা আমাকে সংবর্ধনা দিয়েছে খুবই আন্তরিক পরিবেশে। সেখানে প্রশংসাও ছিলো সমালোচনাও ছিল বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে। বিএনপির ওখানে গেলাম, আওয়ামী লীগাররা কিছু মনে করেনি। আওয়ামী লীগের ওখানে গেলাম, বিএনপি ওয়ালারাও কিছু মনে করেনি। বস্টনের বাংলাদেশীদের এই যে সহনশীলতা, আমার খুবই ভাল লেগেছে। বস্টনে আরেকটি অভিজ্ঞতা হলো ‘বেইন’ নামের সংগঠন ঘিরে। ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর বস্টনে সেই সময়ের কয়েকজন প্রবাসী বাঙালি এই সংগঠনটি গঠন করেছিলেন প্রবাসে থেকে দেশের ¯^াধীনতা আন্দোলনের সহযোগিতার উদ্দেশ্যে। আজও সংগঠনটি ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দু’বছর পরপর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি আসে। কিন্তু প্রবাসের অন্যান্য সংগঠনের মত ভাঙ্গনের মুখোমুখি হয়নি ‘বেইন’। যদিও সংগঠনটিতে নানা মতের নানা ধরনের লোক রয়েছে। বিষয়টি আমার খুবই ভাল লেগেছে। আমি প্রতিশ্রæতি দিয়ে বলেছি, আমার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করবো- বেইন যেন ¯^াধীনতা বা একুশে পদক পায় বাঙালি কম্যুনিটি গঠনে অবদানের জন্য।
আরেকটি জিনিষ আমি লটারী পাওয়ার মত পেয়ে গেছি সেখানে। ওখানকার এক ভদ্রলোক নিয়ে গেলেন, কেনেডী যে বাড়িতে জন্মে ছিলেন সেই বাড়িতে। ছোট বাড়ি। সেখানে দেখলাম যে দিন কেনেডী ডালাসে নিহত হয়েছিলেন তার পরদিনের ‘ডালাস ট্রিবিউন’ নামের পত্রিকাটির কপি সেখানে আছে। সাড়ে ১৬ ডলার দিয়ে ৫২ বছর পর পত্রিকার ১টি কপি কিনলাম। এটা আমি মনে করি আমার জীবনের একটা অমূল্য সম্পদ। সম্ভবত বাংলাদেশে আর কারো হাতে এই সংগ্রহ নেই। পত্রিকাটি পেয়ে আনন্দে আমার চোখে পানি এসেছিল।
ঠিকানা : কেন?
উত্তর : আমি ব্যক্তিগতভাবে কেনেডী অনুরাগী। তিনি যখন প্রেসিডেন্ট হন, তখন আমি ছাত্র ছিলাম। ওবামার নির্বাচন যেমনি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তেমনই কেনেডীর নির্বাচনও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আমার বড় ভাই চাইতেন নি·ন জিতুক, আমি চাইতাম কেনেডী জিতুক। আমার কাছে মনে হয়, কেনেডীর আগের আমেরিকা আর কেনেডীর পরের আমেরিকার আকাশ-পাতাল পার্থক্য। কেনেডী হত্যার ঘটনা সেই সময়ে এমনকি আজো আলোড়িত হত্যাকান্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই হত্যাকান্ডের পরের একটা ডকুমেন্টেশন আমি সাংবাদিক হিসেবে সংগ্রহীত করতে পারায় আনন্দে চোখে পানি এসেছিল আমার।
নিউইয়র্কে আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদ আমার সঙ্গে একটা মতবিনিময়ের আয়োজন করলেন।
ঠিকানা : কারা ছিলেন ওখানে?
উত্তর : রতন বড়ুয়া, টমাস দুলু রায়, নবেন্দু, শিতাংশু গুহরা। আমার মনে হয়েছে আমি যদি রতন বড়ুয়ার বাসায় না উঠতাম, তাহলে হয়তো আমাকে আমন্ত্রণ করা হতোনা। আমার কাছে মনে হয়েছে তাদের এ মতবিনিময়ের উদ্দেশ্য ছিল আমাকে গালাগালি করার জন্য, আমার কঠোর সমালোচনা করার জন্য। পরে অবশ্য দু’একজন ¯^ীকারও করেছে, আমার অনুমান সত্যি ছিল। অনুষ্ঠানে গেলাম। অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশ আলোচনা হলো। আমি আমার দৃষ্টি ভঙ্গি ব্যাখ্যা করলাম।
আমি বললাম, বাংলাদেশে শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু নয়- জাতিগত সংখ্যালঘুর মধ্যেও অনেক ক্ষোভ রয়েছে। অনেক বেদনা আছে। তারা মনে করে আমরা বৈষম্যের শিকার। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, মুসলমানরাও কি ভাল অবস্থায় আছে? তাদের জন্য যদি আপনাদের মন না কাঁদে, তাহলে আপনাদের মানবাধিকার চেতনাটাতো খন্ডিত চেতনা হয়ে গেল?
আমি সবার উদ্দেশ্যে বললাম, আমি কিন্তু বাংলাদেশে হুজুরদের সাথে মিশি। আমি বছরে চার পাঁচবার ২১ শতকের হাদিস শরীফের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বক্তৃতা করি। হাদিস আমার স্পেশালিটি। বিভিন্ন মাদ্রাসায় তারা ডাকে। আমি যাই। ফলে অন্তত ২০০ জন সিনিয়র হুজুর, যারা আগে ওয়াজ করতে উঠলেই হিন্দুদের একচোট গালি দিত- যেহেতু দাদার সাথে তাদের দাদা ভাই সম্পর্ক হয়ে গেছে- সে কারণে তারা আর হিন্দুদের গালাগালি করেনা। তাহলে আপনারাই বলুন, আমি কি আমার সম্প্রদায়ের উপকার করিনি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সাথে যুক্ত না থেকেও।
এসব বলাতে দেখলাম অনেকেরই চৈতন্যের উদয় হয়েছে। রতন বড়ুয়া তখন বললেন, দাদা আমিতো এসব ভোদভেদ মানিনা। আমি বললাম এটাই স্পিরিট হওয়া উচিত। ওখানে ঐদিন আ’লীগের এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শশু¢ উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমার কথাকে সমর্থন জানিয়ে বললেন, আমি যে এলাকা থেকে এমপি নির্বাচিত হই, সে এলাকার হিন্দু ভোটার মাত্র ৫ শতাংশ। মুসলমানরা ভোট দেয় বলেই আমি ৪ বার জয়ী হয়েছি। এমনকি একবার চরমোনাই পীরকে হারিয়েও আমি জিতেছি।
ঠিকানা : টেলিভিশন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-র“নি হত্যাকান্ড কি রহস্যই থেকে যাবে?
উত্তর : সাগর-র“নি হত্যাকান্ডের পর যেটা রহস্যজনক ব্যাপার- যে কোন হত্যাকান্ড শেষে পুলিশ কিন্তু সন্দেহজনক হিসেবে কাউকে না কাউকে আটক করে এবং কুও উদ্ধার করে । আমাদের পুলিশবাহিনীর বির“দ্ধে দুর্নীতির যত অভিযোগই থাকুক,তাদের দতা কিন্তু প্রশ্নাতীত। কিন্তু সাগর-র“নির হত্যাকান্ডে তারা একজনকেও গ্রেফতার করতে পারলো না। হত্যাকান্ডের একমাত্র প্রত্যদর্শী হচ্ছে তাদের ছোট ছেলে মেঘ। মেঘ বলেছিল আমি আঙ্কেলদের চিনি। পুলিশ বা ডিবি যাদের ডেকেছিল জিজ্ঞাসাবাদের নামে, তাদের একজনকেও মেঘের মুখোমুখি করে জিজ্ঞেস করে বলা হয়নি দেখতো চিনতো পার কীনা? এটাই রহস্য। একদিন আইজি ডেকে পাঠালেন প্রেস কনফারেন্স-এ কথা বলবেন বলে। সাংবাদিকরা বসে আছেন নির্দিষ্ট জায়গায় । কিন্তু কেউ আসছে না। জানা গেল সিনিয়র পুলিশ অফিসাররা বৈঠক করছেন, কি জানাবেন সাংবাদিকদের -তা নিয়ে। দু ঘন্টা পর এসে যা বললেন, তাতে প্রতিটা সাংবাদিকের ধারণা হলো- বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে। আমাদের সাংবাদিকতা পেশা দুজন ব্যক্তি বেইজ্জত করেছে। একজন পত্রিকা মালিক, আরেকজন টেলিভিশনের মালিক। তারা দু’জন কীভাবে যেন ডক্টরেট ডিগ্রী যোগাড় করে নামের আগে জুড়ে দেয়। অথচ উনারা জানেন কিনা জানিনা, নিজ নিজ অফিসের মধ্যেই সাংবাদিকরা হাসি-ঠাট্টা করে বলেন- ড. অমুক, ড. তমুক। সম্প্রতি এটিএন-র মালিকের লন্ডনে দেয়া বক্তব্য নিয়ে যা হচ্ছে, তাতে সন্দেহের তীর উনার দিকে তাক করে আছে। এইতো ক’দিন আগেই নিউইয়র্কে তাদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আমাকে যেতে হয়েছে। গিয়ে দেখি এখানকার স্টাফরা কোথায় আনন্দের কথা বলবে, তারা বার বার এপলোজী ¯^ীকার করতে ব্যস্ত।
ঠিকানা : কিসের জন্য এপলোজী চাইছেন?
উত্তর : ঐ যে ঢাকায় যে কুৎসতি ঘটনা ঘটেছে, সে কারণেই হয়তো। তারা মুখে কিছু বলছে না কিন্তু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ঐ একই কথা বলার চেষ্ঠা করছেন।
ঠিকানা : আপনি কি মনে করেন সাগর-র“নির হত্যাকান্ডে জড়িতদের পরিচয় আমরা পাব?
উত্তর : কোন না কোনদিনতো আমরা জানবোই।
ঠিকানা : তাহলে বর্তমান সরকারের আমলে নয়?
উত্তর : এই সরকারের আমলে উদঘাটিত হবে বলে আমি মনে করি না।
ঠিকানা : বর্তমান আমলে আরেকটি জিনিষ খুব ল্যণীয়, যে কোন বিষয়ে সবাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে চায়। তার মানে কি আর কাউকে তারা বিশ্বাস করতে পারছে না?
উত্তর : এটা ঠিক। জুতা সেলাই থেকে চন্ডি-পাঠ পর্যš— সবকিছু যদি একজন ব্যক্তিকে করতে হয়, সেটাতো গণতন্ত্র হলোনা।
ঠিকানা : নাকি ফটো সেশনের জন্য করা হয়?
উত্তর : কীসের জন্য করা হয় জানি না, তবে ব্যাপারটি অ¯^াভাবিক। গণতান্ত্রিক কেন, ¯ৈ^রাতান্ত্রিক শাসনেও কিছু সিস্টেম থাকে। কিন্তু আমাদের এখানে সবকিছু হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরেই।
ঠিকানা : সম্প্রতি এটিএন বনাম বাংলাদেশের সমগ্র সাংবাদিক মহলের মধ্যে যে মলযুদ্ধ হলো। এ সম্পর্কে আপনার মš—ব্য কী?
উত্তর : সাংবাদিকদের মধ্যে সরাসরি বিভক্তি বেশ কয়েক বছর আগেই হয়েছিল। তার আগে ছিলোনা। আমি ১৯৮১ সালে অবিভক্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম। আমিই সরাসরি ভোটে জেতা প্রথম হিন্দু সাংবাদিক। আমার আগে নির্মলদা সভাপতি ছিলেন নির্বাচন ছাড়াই। উনার বিরুদ্ধে কোনো প্রার্থীও ছিলো না। কেবিনেটে আমরা যে প্যানেলটি জিতে ছিলাম সেখানে ছিলেন ইকবাল সোবহান চৌধুরী আওয়ামী লীগপন্থী, আমি সঞ্জীব চৌধুরী ছিলাম বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, কাদের মোল্লা ছিলেন জামায়াতের গুর“ত্বপূর্ণ নেতা, আমানুলাহ কবীর ছিলেন বামপন্থীদের প্রতিনিধি। আমরা সবাই মিলে মিশেই প্যানেল করেছিলাম। যদিও আমরা ৪ জনই ছিলাম রাজনৈতিকভাবে বিপরীতধর্মী লোক। ধীরে ধীরে সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি আসলেও চক্ষু লজ্জাটা অš—ত ছিলো। কিন্তু সাগর-রুনির হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে সেই চুলজ্জাটাও নেই।
আমার মাঝে-মধ্যে সন্দেহ হয়, তথ্য প্রমাণ দিতে পারবো না, কোন একটা মহল (ঘরের বা বাহিরের) ধীরে ধীরে আমাদের সব ইনস্টিটিউশনের মর্যাদা ধ্বংস করার জন্য অব্যাহতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা না বুঝে সেই চেষ্টার ফাঁদে পা দিয়ে ফেলি।
ঠিকানা : এগুলোর পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অস্থির। নতুন যোগ হয়েছে পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি।
উত্তর : পদ্মা সেতু নিয়ে যে নাটক শুরু হয়েছে এবং নাটক যখন কাইমে·ে পৌঁছেছে তখন আমি আমেরিকায়। আমার কথা হচ্ছে, সিদ্ধাš— নিতে হবে আমি কি কর্জ করে সেতু বানাবো না নিজের চেষ্টায় বানাবো? ৭১’র চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে সবাই একদিনের শ্রম দেব, এক বেলা না খেয়ে থাকবো-এগুলো যদি কমিটমেন্ট হয়, তাহলে শুর“ থেকে কেন করা হলো না। আমার বির“দ্ধে চুরির অভিযোগ ওঠার পর আমার মধ্যে কেন ৭১’র চেতনা জাগিয়ে উঠলো। ৭১’র চেতনা আগে কোথায় ছিলো? আসল বিষয় অন্য জায়গায়? েিধ বেড়ে গেছে। চাহিদা বাড়ছে। ছোট ছোট প্রজেক্টে হচ্ছে না। বড় বড় প্রজেক্ট চাই। না হলে বড় বড় কমিশন কোথা থেকে আসবে। বড় বড় ফান্ড কীভাবে সংগৃহীত হবে।
ঠিকানা : এটাতো শুধু এই সরকারের সময়ই নয়, আগের সরকারের সময়ও ল্য করা হয়েছে।
উত্তর : এটা ঠিক। তবে ঐ যে বললাম, ক্ষিধে বাড়ছে-চাহিদাও বাড়ছে। আপনি নিশ্চিত থাাকতে পারেন শাšি—পূর্ণ নির্বাচন হলে আগামীবার মতায় আসছে না আওয়ামী লীগ। বিএনপি আসলেও একই কাজ হবে, একই ধারা চলবে?
ঠিকানা : এসব থেকে পরিত্রাণের কী উপায় নেই?
উত্তর : আমার বউ গৃহবধু। বলে যে, আমি সাংবাদিকও না-রাজনীতিকও না। মিলিটারি আসলে ভালো থাকি। তার মানে আমি সামরিক শাসন সমর্থন করছি না। আমি গণতন্ত্রের পক্ষে লড়েছি, লড়বো-কিন্তু বউকে আমি বাধা দেব কীভাবে? বউ বলছে, তোমরা মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দিনকে গালি দাও কিন্তু তাদের দুই বছরে আমার সন্তান ঘরের বাইরে গেলে নিশ্চিত থাকতাম। কিন্তু এখন ভয় পাই। বলেন, আমি কী জবাব দেব?
ঠিকানা : বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম হয়েছেন। বেঁচে আছেন কিনা কেউ জানেন না। মিডিয়ার পাতা থেকেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ঢাকায় সাংবাদিকদের মধ্যে ইলিয়াস আলী নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়। যা মিডিয়ায় আসছে না। আপনার দৃষ্টিতে এ বিষয়টির মূল্যায়ন কীভাবে?
উত্তর : আমাকে মেরে ফেলা হলেও বলবো, সরকারের কোন না কোন এজেন্সির লোক ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করেছে। এবং কোন না কোন এজেন্সির লোক ইলিয়াস আলীকে মেরে ফেলে তাঁর লাশ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।
ঠিকানা : আপনি কী মনে করেন বিএনপি আন্দোলনের ঘটনা ইলিয়াস আলীর খুনকে আরো ত্বরান্বিত করেছে?
উত্তর : যে কারণেই ত্বরান্বিত হোক, যারা মেরে ফেলেছে-তারা খুনী। একদিন না একদিন তাদের মুখোশ উন্মোচিত হবেই, তাদের বিচার হবে, তাদের শাস্তি হবে। বিএনপি রাজনৈতিক দল। ইলিয়াস আলীকে ঘিরে তারা তাদের মতো আন্দোলন করেছে। হয়তো কিছুটা সফল হয়েছে, কিছুটা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ইলিয়াস আলীর মতো একজন জলজ্যান্ত মানুষ যে গুম হয়ে গেছে, এতেতো কোনো সন্দেহ নেই। এবং সরকারের লোকজনই গুম করেছে। তা সরকারের কট্টর সমর্থকরাও বিশ্বাস করে। আমি দায়িত্ব নিয়েই বলছি, সরকারের অর্ধেকেরও বেশি সমর্থক বিশ্বাস করে সরকারের লোকজনই ইলিয়াস আলীকে মেরে ফেলেছে।
ঠিকানা : আপনি আমার দেশ পত্রিকায় আছেন। মাহমুদুর রহমান আপনার সম্পাদক। বর্তমান সরকারের আমলে তিনি অনেকদিনই জেলে ছিলেন। নির্যাতনেরও অভিযোগ রয়েছে। আসলে কি লেখা হয়েছিল, আর কিইবা ঘটলো পরবর্তীতে।
উত্তর : মাহমুদুর রহমান জ্বালানি উপদেষ্টা ছিলেন আগের সরকারের সময়ে। উনার একটা যোগযোগ আছে জ্বালানি সংশিষ্ট সব দপ্তরের সাথে। যার ফলে উনার পরিচিতদের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, জ্বালানি সংশিষ্ট একজন নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারি একটি চিঠি দিয়েছেন মন্ত্রণালয় বরাবরে। যে চিঠিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অভিযোগ এনে তদন্তের জন্য পাঠিয়েছিলেন। চিঠিতে শেভরনকে বিনা টেন্ডারে কাজ দিতে গিয়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ আদান-প্রদানের তথ্য দেয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছিল এই ঘুষের একটা অংশ পেয়েছেন বর্তমান জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক এলাহী। বড় আরেকটি অংশ তৌফিক এলাহী নিজে ওয়াশিংটনে নিয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে দিয়েছে।
আমাদের সরকারের মধ্যে নানান ধরনের ‘কেলাসনেস’ থাকে। এই চিঠিটা যে পেয়েছে, সে ধুর বলে ছিড়ে ফেললেই কিন্তু আর কিছু হতো না। কিন্তু ঐ ব্যক্তি যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হোক বলে চিঠিটি পেট্টোবাংলায় ফরোয়ার্ড করেন। পেট্টো বাংলা এই চিঠি পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লোকদের নাম দেখে ফেরত পাঠায় মন্ত্রণালয়ে। চিঠির ফটোকপি এরই মধ্যে আমার দেশের হাতে চলে আসে। আমার দেশ পত্রিকা তখন লিখলো, এরকম একটি অভিযোগ উঠেছে এবং এর ভিত্তিতে চিঠি চালাচালি হচ্ছে। আমার দেশ কোন মন্তব্য করেনি। ছাপার পর এখান থেকে, ওখান থেকে মামলা হওয়া শুরু হলো মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে। তারা মনে করেছিলো মাহমুদুর রহমান ভয় পেয়ে এসব নিয়ে আর ঘাটাবেন না। কিন্তু আমার দেশ তার অবস্থান থেকে সরেনি। তখন সরকারের উপরের পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়, মাহমুদুর রহমানকে ধরতে হবে। তাদের ভাষায়, একটা শিা দিতে হবে। তারা কীভাবে শিক্ষা দিয়েছে, দেশবাসী জানে। শিা দিতে গিয়ে তারা কী শিক্ষা পেয়েছে, দেশবাসী তাও জানে।
ঠিকানা : বাংলাদেশে চর দখলের মতো রাজনীতি আর কতদিন? আজ একদল তো, কাল আরেক দল। কতো দিন এভাবে চলবে?
উত্তর : একদিন না একদিন গণ বিস্ফোরণ ঘটবেই। আইয়ুব খান-মোনায়েম খান কল্পনাই করতে পারেনি, বাংলাদেশের মানুষ এভাবে বাঁশের লাঠি নিয়ে রুখে দাঁড়াতে পারবে। এরশাদ মনে করেছিলেন, উনি ঠিকভাবেই সরকার চালাচ্ছেন। উনি কি জানতেন উনার পরিণতি এভাবে হবে? বাঙালিরা কিন্তু ‘আনপ্রেডিক্টেবল জাতি’।
ঠিকানা : বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারের বির“দ্ধেই কম বেশি ভারতপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশপ্রেমী সরকার আমরা কবে পাবো?
উত্তর : বাংলাদেশের দুই কিংবদš—ীর নেতাকে অত্যš— কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যজন শহীদ জিয়াউর রহমান। মানুষ যতই বঙ্গবন্ধুকে ভারতের দালাল-টালাল বলুক, উনার সাড়ে ৩ বছরের শাসনে তার রাজনৈতিক গুর“ মাওলানা ভাসানির সাথে গোপনে নিয়মিত পরামর্শই করতেন কি করে ভারতের আধিপত্য ঠেকিয়ে দেশ চালানো যায়। বঙ্গবন্ধুকে আপ্রাণ চেষ্টা করতে দেখতাম। তিনিই বাংলাদেশের একমাত্র নেতা যিনি, বুক টান টান করে দিলির সাথে সমানতালে কথা বলতেন। উনার পরে এ পর্যন্ত একমাত্র জিয়াউর রহমান সফল হন বা না হন ভারতের আধিপত্যকে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। উনি অনেক পদপেও নিয়েছিলেন। বাকিদের সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত ধারণা, প্রকাশ্যে যাই বলুন না কেন তলে তলে তারা দিল্লির ছাত্রছায়ায় থাকতে ভালোবাসেন।











