স্মৃতি রোমন্থন আর চোখের জলে হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ
সিলেট সংবাদ : মঞ্চে তখন গান বাজছে। হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় গান। ‘চান্নিপসর রাইতে যেনো আমার মরন হয়।’ মিলনায়তনে জড়ো হওয়া অভ্যাগতরা কণ্ঠ মেলাচ্ছেন এই গানের সাথে। আর মঞ্চের ঠিক সামনেই উপবিষ্ঠ হুমায়ূন আহমদের মা, প্রথম স্ত্রী, সন্তান আর বোনেদের চোখে তখন জল। তাদের চোখের এই অশ্র“ লেগেছিলো অনুষ্ঠানের একেবারে শেষমূহূর্ত পর্যন্ত। মাঝেমাঝেই মিলনায়তনে উপস্থিত হুমায়ূন ভক্তরাও শরীক হয়েছেন এই অশ্র“পাতে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সোমবার আয়োজন করে হুমায়ূন আহমেদ স্মরণ সভার। এই সভায়ই দেখা যায় এমনদৃশ্য। সকাল ১১ টা স্মরণ সভা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়েই অনেক আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল অডিটোরিয়াম পূর্ন হয়ে যায়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই সবাই এক মিনিট নিরব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। প্রিয় লেখকের জন্য শ্রদ্ধাবনত হয়ো পুরো মিলনায়তন। স্মরণ সভাটি মূলত পরিণত হয় স্মৃতি চারনমূলক সভায়। আলোচকরা হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে তাদের নানা স্মৃতির বর্ণনা দেন। আর কে না জানে, স্মৃতি সততই বেদনা জাগায়। সোমবার শাবিতেও স্মৃতি বেদনা জাগালো। এই বেদনা ফুটে ওঠলো অনেকের চোখেও। ফলে স্মৃতি আর চোখের জলেই শাবিতে স্মরণ করা হলো বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় এই কথাসাহিত্যিককে।
স্মরণ সভায় লেখক অনুজ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, প্রিন্স চার্লস এবং হুমায়ুন আহমেদ এর জন্ম একই তারিখে। এক জন জন্মের পরই পেলেন বিশ্বকাঁপানো পরিচিতি। আর তা দেখে বাবা বললেন আমার ছেলেও এক দিন অনেক বড় হবে, বিখ্যাত হবে। তিনি তা হতে পেরেছিলেন। লেখক হুমায়ুন আহমেদ একাধারে ছিলেন প্রতিভাবান অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, জাদুশিল্পী। হুমায়ূন আহমেদ এমনই শক্তিশালী একজন লেখক যিনি একটা প্রজন্ম নয়, দেশের কয়েকটা প্রজন্মকে বড় করেছেন।
শেষ সময়ে হুমায়ূন আহমেদে এর শয্যাপাশে থাকা লেখকের এই সহোদর তাঁর চলে যাওয়ার সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, হার্টবিট দেখার ফাঁকে এক সময় বিটগুলো স্ট্রেইট লাইন হয়ে যায়। মৃত্য যে স্পষ্টভাবে দেখা যায় তখন বিশ্বাস হলো। নিজের হাতে ধরে থাকা মানুষটা আর আমাদের মধ্যে নেই। হয়তোবা হুমায়ূন আহমেদ দৃশ্যটা দেখতে পেলে সুন্দরভাবে বর্ণনা করতেন তাঁর কোনও লেখায়। তবে করে বিষয় হলো তিনি সেই দৃশ্যতে আটকে গেছেন।
বাবার সাথে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণ করে আবেগ আপ্লুত হুমায়ূন কন্যা শিলা আহমেদ বলেন, ছোট বেলায় একদিন বাবা চকলেট প্যাক এবং একটি চিরকুট দিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল লেখক বাবার সন্তান হওয়া খুবই করে। জীবনে অনেক করে সময় কাটানোর পর শহীদ মিনারে রাখা বাবার কফিন ঘিরে হাজারো ভক্তের ভালবাসা দেখে অনেক বেশি গর্বিত হই। এ সময় পুরো অডিটোরিয়াম জুড়ে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দর্শক-শ্রোতা এবং হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের সকলেই এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেন।
আমন্ত্রিত আলোচক কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেন, একটা সময়ে খ্যাতির চুড়ায় সবাই আরোহন করে। আবার সেখান থেকে সবাইকে নামতে হয়। তবে বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী হুমায়ূন আহমেদ সেই চুড়ায় থেকেই বিদায় নিলেন। ৭২’ সাল থেকে ধারাবাহিক সৃজনশীল কর্মের মাধ্যমে ১৬ কোটি জনতাকে হাসতে এবং বাঁচতে শিখিয়ে তিনি জনগণের আত্মার অংশে পরিণত হয়েছেন। যার জন্য তাঁকে হারিয়ে দেশের মানুষ আজ কাঁদছে। তিনি বলেন, আমাদের জীবনে আগেও বৃষ্টি ছিলো, জোছনা ছিল; কিন্ত জোছনা ও বৃষ্টিকে তিনি আমাদের মধ্যে নতুন ভাবে নতুন করে উপস্থাপন করেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের প্রয়ান দিবসে তাঁকে স্মরণ করে তিনি আরো বলেন, হুমায়ূন আহমেদ তাঁর কর্মে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনান্দ দাসের বিভিন্ন উক্তি তুলে ধরেন। ফলে আমরা তাঁদের সাহিত্যের প্রতি অনেক বেশি উদ্বুদ্ধ হই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু পরিষদ এর সাধারণ সম্পাদক সহকারী অধ্যাপক ফারুক উদ্দিন এর পরিচালনায় এবং ফিজিক্যাল সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনুছ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্মরণ সভার প্রধান অতিথি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সালেহ উদ্দিন বলেন, একটি কারণে হুমায়ূন আহমদকে এ দেশের মানুষ স্মরণ রাখবে-তা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধকে অবিকলভাবে মানুষের কাছে তুলেধরা। ‘আগুনের পরশমনি’ এর বাস্তব উদাহরণ। হুমায়ূন আহমেদ দেশীয় লোকজ শিল্পকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গণে তুলে ধরে এ দেশের সম্মান বৃদ্ধি করেছেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস উদ্দিন বিশ্বাস, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. সুশান্ত কুমার দাশ, লেখকের ভ্রাতৃবধু ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক। আলোচক ছিলেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আ.ক.ম মাহবুবুজ্জামান, রসায়ন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক ড. রোকসানা বেগম, কথা সাহিত্যিক প্রশান্ত মৃধা, সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ও প্রভাষক জফির সেতু, সিএসই বিভাগের প্রভাষক আলী ইবনে সিনা এবং অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র সাব্বির আহমদ। আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজ, প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন খান, বিপাশা আহমেদ, হুমায়ূন আহমেদের তিন বোন, হুমায়ূন আহমেদের খালা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।











