হুমায়ূনের শোকসভায় কাঁদলেন গুলতেকিন
>>>>নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নাগরিক শোক সভায় অঝোরে কাঁদলেন লেখকের প্রথম স্ত্রী স্মৃতিকাতর গুলতেকিন খান। গতকাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের মঞ্চে লেখকের সতীর্থরা যখন বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতিচারণ করছিলেন তখন মাঝে মধ্যেই ৩০ বছরের দাম্পত্যের স্মৃতি মনে করে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন গুলতেকিন। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর গুলতেকিন খানের শোক প্রকাশ আর শেষ শ্রদ্ধা জানানো নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা চলে। মৃত্যুর নয় দিন পর গতকালই প্রথম কোনো অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে দেখা গেল গুলতেকিনকে। অনুষ্ঠান শুরুর পরপরই চার সন্তান নোভা, বিপাশা, শিলা ও নুহাশকে নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন গুলতেকিন। পুরোটা সময় নিশ্চুপ অবস্থায় কাটান তিনি। আলোচনার মাঝে একবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। গণমাধ্যমকর্মীরা তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। অনুষ্ঠানে গুলতেকিনের চোখে-মুখে ছিল শোকের ছাপ। শোক জানাতে গায়ে জড়ান সাদা-কালো রঙের শাড়ি। মাঝে মধ্যেই চোখের পানি মুছতে দেখা যায় তাকে। তার দুই পাশে বসে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলেন অধ্যাপক জাফর ইকবালের স্ত্রী ড. ইয়াসমিন হক ও গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীর। উল্লেখ্য, গত ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হুমায়ূন আহমেদ। যুক্তরাষ্ট্রে থেকেও স্বামীর লাশ দেখতে যাননি হুমায়ূনের প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন খান। শোক জানাতে তখন দেশেও ফেরেননি তিনি। বৃহস্পতিবার দেশের ফেরার পর গতকালের অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে তিনি হুমায়ূন আহমেদের প্রতি তার পাহাড়সমান শোকের জানান দেন। গণমানুষের ভাষাকে সাহিত্যে তুলে ধরেন হুমায়ূন এদিকে হুমায়ূন আহমেদের শোক সভায় বক্তারা বলেন, হুমায়ূন আহমেদ তার লেখনীর মাধ্যমে নতুন পাঠক সৃষ্টি করেছিলেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সিনেমা হলগুলোতে দর্শক ফিরিয়ে এনেছিলেন। তিনি গণমানুষের নিজের ভাষাকে তার সাহিত্যে তুলে ধরেছিলেন।
জাতীয় গণগ্রন্থাগারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখেন, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, চলচ্চিত্র পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম, সৈয়দ শামসুল হক, ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, হুমায়ূন আহমেদকে যে কত মানুষ ভালোবাসে তার প্রমাণ পাওয়া যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যেদিন তার মরদেহ রাখা হয়েছিল সেদিন। সর্বস্তরের মানুষ এসেছিল তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। সৈয়দ শামসুল হক বলেন, হুমায়ূন আহমেদ আমাদের মাঝে চিরদিন তার কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকবেন। আগামী ২০১৩ সালের একুশে বইমেলা তার নামে উৎসর্গ করার দাবি জানান তিনি। সরকারের প্রতি তিনি বাংলাবাজারের একটা রাস্তা যেন হুমায়ূন আহমেদের নামে করারও দাবি জানান। হুমায়ূন আহমেদের ছোটভাই ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, হুমায়ূন আহমেদ একজন অসম্ভব সৃষ্টিশীল মানুষ ছিলেন। তিনি ভালো গল্প লিখতেন, নাটক লিখতেন, সিনেমা বানাতেন, ছবি আখতেন, জাদু দেখাতেন। তিনি যে এতটা জনপ্রিয় হবেন তার কাজের মাধ্যমে তা কল্পনাতীত। নাট্যব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর তার বক্তৃতার শুরুতেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আড্ডার মাধ্যমেই আমাদের সম্পর্কের শুরু। কিছুদিন আগেও যে মানুষটির সঙ্গে আমি নিউইয়র্কে আড্ডা দিয়ে এলাম আর আজ সে মানুষটির স্মরণসভা। আমার জীবনের হুমায়ূন আহমেদের অবদান অনেক। বাকের ভাই চরিত্রের মধ্যদিয়ে তিনিই আমাকে সর্বপ্রথম মানুষের মাঝে পরিচিত করেছেন। নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একই সঙ্গে জনপ্রিয় ও মানসম্পন্ন লেখক। তিনি যা সত্য মনে করতেন তা অকপটে বলতেন। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি সরাসরি যুক্ত না হলেও তিনি বিভিন্ন সময় তার লেখনীর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে বেগবান করছেন। চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম বলেন, হুমায়ূন আহমেদ তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সঞ্চারিত করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছেন। অনুষ্ঠান শেষে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে হুমায়ূন আহমেদের একটি তৈলচিত্র তার পরিবারে সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।











