সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় ফের বন্যা : সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
>>>>টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় আবারো বন্যা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক বন্যার পানি নামতে না নামতেই ফের বন্যা মানুষকে চরম দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আকস্মিক এ বন্যায় মানুষ অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এমনকি সিলেটের সাথে বিভিন্ন উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। গোয়াইনঘাটের সাথে সকল প্রকার সড়ক যোগাযোগ এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ছিল। বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা বন্যার সর্বশেষ সংবাদ পাঠিয়েছেন।
কানাইঘাট থেকে সংবাদদাতা জানিয়েছেন. গত কয়েকদিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কানাইঘাটে সুরমা-লোভা-সিঙ্গাইরসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করায় ফের কানাইঘাটে বন্যার আশংকা দেখা দিয়েছে। সুরমা নদীর বিভিন্ন ভাঙ্গন দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ইতিমধ্যে উপজেলার নিুাঞ্চল বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যার রেশ কাটতে না কাটতে ফের বন্যার আশংকায় জনমনে দুঃশ্চিন্তা ও কৃষকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। আবারও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিলে উপজেলা জুড়ে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি সাধিত হবে। পাশাপাশি বিগত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা-ঘাটের আরও বেহাল দশা ও নদী ভাঙ্গন মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে বলে শংকিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় জনসাধারণ। উল্লেখ্য যে, বিগত বন্যায় কানাইঘাটের বিভিন্ন পাকা-কাঁচা রাস্তাঘাট, নদীভাঙ্গন, কৃষি ও মৎস্য সেক্টরে অন্তত ৭০ কোটি টাকার মতো ক্ষতিসাধিত হয়। পাশাপাশি প্রায় ২’হাজার বসতঘর বিধ্বস্ত এবং আংশিক আরো ৫’হাজার বাড়ীঘর ক্ষতি সাধিত হয়ে অনেকে এখনো গৃহহীন অবস্থায় অন্যত্র বসবাস করছেন।
এস এম রাজু, জৈন্তাপুর থেকে জানিয়েছেন, জৈন্তাপুরে গত ৬ দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলে আবারও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। দু’উপজেলায় অন্তত ৫ লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ছে। পানিবন্দী হয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে অনেকে। সাধারণ লোকজন’র জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। গত সোমবার হতে সীমান্ত উপজেলা জৈন্তাপুরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে ফলে নদ-নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে গোয়াইনঘাট উপজেলার রাধানগর, হরুখৈল, নয়ানগর, পুন্ননগর, বারকীপুর, সাতাইন, আহারকান্দী, মাতুর তল, হাজীপুর, নয়াগাঙ্গের পাড়, বাউর ভাগ, বৃত্তিখৈল, নাইন্দার হাওর, তিতকুল্লীর হাওর, রাজবাড়ী কান্দী, বুধিগাঁও হাওর, সানকী ভাঙ্গা, আসামপাড়া, নবমখন্ড, অষ্টম খন্ড, লাখের পাড়, কান্দুবস্তী, নয়াবস্তী, মামার বাজার, মোহাম্মদপুর, এলাকার লোকজন পানিবন্দী হয়ে পড়ছে। জাফলংয়ের বল্লাঘাট পাথর কোয়ারী ও অপরদিকে জৈন্তাপুর উপজেলার শেওলার টুক, বাওয়ন হাওর, সাতলারপার, ডুলটিরপার, আমবাড়ী, খরুবিল, লক্ষ্মীপুর, বিড়াখাই, কইনাখাই, বাউরভাগ, মল্লিপুর, হর্ণি, দরবস্ত, সেনগ্রাম, গদ্দর্না, মোহাইল, উত্তর মোহোইল, সারীঘাটসহ বেশ কয়েকটি এলাকার লোকজন পানিবন্দী হয়ে পড়ছে। এদিকে শ্রীপুর পাথর কোয়ারী বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। প্রলয়ঙ্ককরী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ছিল অতিষ্ঠ। বন্যার পর বন্যা কবলিত এলাকার মানুষগুলো বিভিন্ন প্রকার রোগ ব্যাধিতে ছিল আক্রান্ত, চারিদিকে শুধু হাহাকার ডায়বিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, ইনফ্লুয়েঞ্জা, কলেরা। এরই মধ্যে শুরু হওয়া ছয় দিনের টানা বৃষ্টিতে মানুষের মনে অস্বস্তি নেমে আসে। গত ছয় দিনের টানা বৃষ্টির ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত সোমবার রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি ভারী বর্ষণে আবারও পাহাড়ী ঢল নামে এতে করে সব-কটি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এতে করে বন্ধ হয়ে পড়ে জাফলংয়ের বল্লাঘাট ও শ্রীপুর পাথর কোয়ারীসহ বেশ কয়েকটি শ্রমিকদের পাথর ও বালু উত্তোলনের কোয়ারী। প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক শ্রমিককে কর্মহীন অবস্থায় দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।
প্রলঙ্ককরী বন্যায় কৃষকদের রোপণকৃত আমন ও বিভিন্ন জাতের শাকসবজি পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। বন্যার পানি কমে যাওয়ার কৃষকদের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছিল। গত সোমবার থেকে টানা বৃষ্টির ফলে গতকাল রবিবার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলের লোকজনদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিছিন্ন হয়ে পড়ছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চলের কৃষকদের ঘরবাড়ি, রোপণকৃত বীজতলা তলিয়ে যাওয়া বীজতলা দ্বিতীয় বার বীজ রোপণ করার মত বীজ আর কৃষকদের হাতে আর নেই। তাই স্থানীয় কৃষকরা চিন্তিত। সোমবার রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢল নামে এতে করে সব-কটি নদীর পানি বৃদ্ধি পায় এবং নিমাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অনেক ঘর বাড়ি পানির নিচে ডুবে যায়। বন্ধ হয়ে পড়ে জাফলংয়ের বল্লাঘাট ও শ্রীপুর পাথর কোয়ারীসহ বেশ কয়েকটি শ্রমিকদের পাথর ও বালু উত্তোলনের কোয়ারী। প্রায় পাঁচ শ্রমিককে কর্মহীন অবস্থায় দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।
গোয়াইনঘাট থেকে ফয়সল আহমদ সাগর জানিয়েছেন, গোয়াইনঘাটে পাহাড়ি ঢলে আকস্মিক বন্যায় প্রায় দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে। বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় বন্ধ রয়েছে স্কুল, কলেজ ও হাট বাজার। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সিলেটের সাথে গোয়াইনঘাটের সকল প্রকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এদিকে ছাতক থেকে আতিকুর রহমান মাহমুদ জানিয়েছেন, তিন দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ছাতক উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা আবারো প্লাবিত হয়েছে। ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে আবারো বন্যা দেখা দেওয়ায় কৃষক ও সাধারণ মানুষ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানিতে পৌর শহরের নিুাঞ্চল সহ উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে পড়েছে। শুক্রবার রাত থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত সুরমা, চেলা ও পিয়াইন নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। উপজেলার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছে। গতকাল রবিবার বিকেল পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ২০ সেঃ মিঃ, চেলা নদীর পানি ১৫ সেঃ মিঃ, পিয়াইন ১৭ সেঃ মিঃ উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারী বর্ষণে নদীতে অত্যধিক স্রোতের কারণে জাহাজ ও বলগেট নৌকায় পাথর লোডিং-আনলোডিং বন্ধ হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়ক রাতেই তলিয়ে যাওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। পৌর শহরের বৌলা, তাঁতিকোনা, মোগলপাড়া, চরেরবন্দ, মন্ডলীভোগ, বাগবাড়ি, লেভারপাড়া, বাঁশখলা, শ্যামপাড়া, কুমনা ও ভাজনা মহল গ্রামের অধিকাংশ বসতঘরে ও আঙ্গিনায় বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। উপজেলার ইসলামপুর, নোয়ারাই, কালারুকা, উত্তর খুরমা, দক্ষিণ খুরমা, জাউয়া, সিংচাপইড়, চরমহল্লা, ছাতক সদর, ছৈলা-আফজলাবাদ, গোবিন্দগঞ্জ-সৈদেরগাঁও, দোলারবাজার ও ভাতগাঁও ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামে বন্যার পানি প্রবেশ করায় অর্ধলক্ষাধিক লোক পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে পাহাড়ি ঢলে কোম্পানীগঞ্জের কোম্পানীগঞ্জ, ভোলাগঞ্জ, কাঁঠালবাড়ি, লম্বাকান্দি, রাজনগর, কলাবাড়ি, পারুয়া, পারকুল, বাহাদুরপুর, নারায়ণপুর, কালিয়াবাড়ি, কালাইরাগ, বুরিডহর, চাটিবহর সহ ৫টি ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। দোয়ারাবাজার উপজেলার টেংরা, আমবাড়ি, মহব্বতপুর, টেবলাই, জিয়াপুর, লিয়াকতগঞ্জ, শরিফপুর, ভোঝনা, সোনাপুর, তেগাঙ্গা, মাইঝখলা, উত্তর ও দক্ষিণ বড়বন্দ, বীরশিং, রাখালকান্দি, রায়নগর, সুন্দরপই, দলেরগাঁও, লামাসানিয়া, লক্ষ্মীপুর, নুরপুর সহ উপজেলার প্রায় দু’শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। চিলাই নদীর ৩টি স্থানে বেড়ি বাঁধ ভেঙ্গে ভোগলা ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম সহ দু’টি বাজার তলিয়ে গেছে। মরাচেলা, সুরমা, কালিউরি, পিলাই ও খাসিয়ামারা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবলবেগে প্রবাহিত হচ্ছে। ভোগলার বিজিবি ক্যাম্প হুমকির মুখে রয়েছে। উপজেলার সীমান্ত এলাকার ৫টি ইউনিয়নের সাথে উপজেলা সদরের যোগাযোগ ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এদিকে সুনামগঞ্জ থেকে একে কুদরত পাশা জানিয়েছেন, টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার, দিরাই, শাল্লা ও ছাতক উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্ল¬াবিত হয়েছে। গতকাল রবিবার দুপুর থেকে সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়া, নবীনগর, ষোলঘর ও শহর পার্শ্ববর্তী জগন্নাথপুর, মঈনপুর, ইব্রাহিমপুর এলাকায় বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করেছে। শহরের ১নং ওয়ার্ডের নবীনগর এলাকার অর্ধশতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গতকাল রবিবার বেলা সাড়ে ৩ টায় সুরমা নদীর সুনামগঞ্জের ষোলঘর পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৮০ সে.মি. ও ছাতক পয়েন্টে ৩০ সে.মি. বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলায় গত ২৪ ঘন্টায় ২১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জেলার দোয়ারা বাজার উপজেলার খাসিয়ামারা নদীর বেড়ী বাঁধ (বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ) ভেঙ্গে সুরমা ইউনিয়নের শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ী ধ্বংস হয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে প্রায় ১’শত একর ফসলি জমির বীজ তলা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো স্থানীয় টিলাগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সমুজ আলী স্কুল কলেজে আশ্রয় নিয়েছে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার প্যানেল মেয়র হোসাইন আহমদ রাসেল, শহরের ১নং ওয়ার্ডের নবীনগর এলাকায় বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। এলাকাটিতে দরিদ্র মানুষ বেশি বসবাস করায় তারা কষ্টে জীবনযাপন করছেন।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে সুনামগঞ্জে আরো এলাকা পানিতে প্ল¬াবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টির আশংকা রয়েছে।
এদিকে, জেলার সবকয়টি বালু-পাথর মহালে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। ফলে বেকার হয়েছে পড়েছে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক।











