বিএনপির প্রভাবশালী ক’জন নেতা দল ছেড়ে বিকল্প জাতীয়তাবাদী শক্তি গঠনের গুজব
>>>>বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেলা চলছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিতে। বিশেষ করে হরতালে গাড়ি পোড়ানো ও ককটেল বিস্ফোরণের মামলায় দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতাদের পালিয়ে থাকার ঘটনায় অবিশ্বাসের মাত্রা আরও বেড়েছে।
এমনকি দলীয় প্রধান খোদ খালেদা জিয়াও হাতে গোনা ক’জন সিনিয়র নেতা ছাড়া আর কারও ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছেন না বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।
দলটির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল থেকেই হরহামেশা নেতাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির ঘটনা ঘটছে প্রধান বিরোধী দলে। প্রভাব বিস্তারের জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের একে অপরকে কোণঠাসা করে রাখার কৌশল আরও বাড়িয়েছে অবিশ্বাসের মাত্রা।
এ অবিশ্বাসকে যেন আরও উস্কে দিয়েছে প্রভাবশালী ক’জন নেতার দল ছেড়ে বিকল্প জাতীয়তাবাদী শক্তি গঠনের গুজব।
এসবে দলটি প্রতিনিয়তই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিএনপির রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে ভাটা পড়ার অন্যতম কারণও নাকি এই সন্দেহ আর অবিশ্বাস। এ পরিস্থিতিতে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে বিরোধী দলের আন্দোলনের শক্তি ও সামর্থ্য নিয়ে সরকারি দলের নেতারা ঠাট্টা-মস্করা করতে থাকায় মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে হতাশা।
নিখোঁজ সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীকে ফেরত পাওয়ার দাবিতে ডাকা ২৯ এপ্রিলের হরতালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে গাড়ি পোড়ানো ও সচিবালয়ে ককটেল বিস্ফোরণের দু’টি মামলায় মির্জা ফখরুলসহ বিএনপির অর্ধশতাধিক নেতার নামে পরপর দু’টি মামলা হয়।
ওই দুই মামলায় গ্রেফতার এড়াতে মির্জা ফখরুলসহ অধিকাংশ নেতা আত্মপোগনে চলে যান। পরে তারা আদালতে আত্মসমর্পণ করলেও ওই ঘটনায় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। একই সময়ে স্থায়ী কমিটির অন্যতম এক সদস্যের নানামুখী কর্মতৎপরতা নিয়েও অবিশ্বাস দানা বাঁধতে থাকে দলের সর্বস্তরে। সময় এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে এ অবিশ্বাস আরও বাড়তে থাকে।
এরপর সংসদের বাইরে তোলা খালেদা জিয়ার বিকল্প বাজেট ভাবনায় যার যার গুরুত্ব নিয়ে স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য এমকে আনোয়ার ও ড. আবদুল মঈন খানের মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব, বিএনপি ত্যাগ করে বিকল্প দল গঠনের জন্য মানবাধিকার সংস্থার ব্যানারে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার তৎপরতা পরিস্থিতি আরও নাজুক করে তুলেছে।
এছাড়া বেশ কিছু জেলায় দীর্ঘ দিনের পরীক্ষিত নেতাদের কমিটিতে গুরুত্ব না দেওয়ায় তৃণমূল পর্যায়েও বাড়ছে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল।
তারপর রয়েছে দলের মধ্যে বহাল তবিয়তে থাকা সংস্থারপন্থিদের সঙ্গে পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের দ্বন্দ্ব। সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত সাদেক হোসেন খোকা ও আব্দুস সালামকে নিয়ে ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি করার কারণেও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মনে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হওয়ার সংশয় রয়েছে।
এসব কারণে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বেশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বলেও খবর দিচ্ছে দলীয় সূত্র।
দলীয় সূত্রের দাবি, দলটির মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতারা জেলে থাকাকালে স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দলটির আপদকালীন নেতার দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া তাকে বিশ্বাস না করায় ওই দায়িত্ব দেন দলের পরীক্ষিত ও বিশস্ত নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামকে।
এসব কারণে আগামী নির্বাচনের আগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতার সাজা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে দলীয় পরিমণ্ডলে।
এ ব্যাপারে দলটির এক প্রভাবশালী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিএনপির ঘরের ভেতরে যে সমস্যা চলছে তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে আগামী নির্বাচনের আগে দলের বেশ কিছু জনপ্রিয় নেতার বিভিন্ন মামলায় সাজা হয়ে যেতে পারে। আর সেটি হলে আগামীতে বিএনপির ক্ষমতায় আসা কঠিন হয়ে পড়বে।”
এদিকে দলের ভেতরের কিছু বিষয় নিয়ে সম্প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের আত্মগোপনের সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি।
মির্জা আব্বাস বলেছেন, “রাজনীতি করতে হলে জেল জুলুম সহ্য করতেই হবে। জেলে যেতে হতে পারে- এটা সবারই মনে রাখতে হবে। কারও ভয় করলে তার রাজনীতি করা উচিত নয়।”
দুঃখ করে তিনি বলেন, “২৯ এপ্রিল বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোট নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর আত্মগোপনে থাকার বিষয়টি রাজনীতিকে কলুষিত করেছে। চলমান আন্দোলন ক্ষতিগস্ত করেছে।”
একই বিষয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থায়ী কমিটির আর এক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, “রাজনীতি করতে এসে গ্রেফতারের ভয় করলে রাজনীতি করা উচিত নয়।”
তিনি বলেন, “জেলে যেতে হতে পারে জেনেই রাজনীতিতে এসেছি।”
শুধু মির্জা আব্বাস আর গয়েশ্বর রায়ই নন, কেন্দ্রীয় নেতাদের আত্মগোপনের ঘটনায় অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে দলের সর্বস্তরে। কেউ কেউ তো আর একটু আগ বাড়িয়ে “ভীত নেতাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা উচিত নয়” বলেও মন্তব্য করছেন।
সদ্য কারামুক্ত এক নেতা বলেন, “জেলে যাওয়ার ভয়ে আত্মগোপনে গিয়ে লাভ হয়নি। বিএনপির রাজনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপির চলমান আন্দোলন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বিএনপি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।”
“বিএনপির ভেতরেই একটি চক্র দলটির ক্ষতি করার জন্য কাজ করছে” বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ৯ বছর আপোষহীন থাকা খালেদা জিয়া আত্মগোপনের পরামর্শ দিয়েছেন বলে বিশ্বাস করতে চাইছে না তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
তাদের প্রশ্ন, “ফখরুল কার বুদ্ধিতে আত্মগোপনে গিয়েছিলেন? এটা যদি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশে হয়ে থাকে তাহলে কে তাকে এ পরামর্শ দিয়েছে তা খুঁজে বের করতে হবে।”
খালেদা জিয়ার হাতকে দুর্বল করতেই এ ষড়যন্ত্র বলেও বিশ্বাস করেন তারা।
কেন্দ্রে এমন অরাজকতার কারণেই নাকি বেশ কয়েকটি জেলায় এখনও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারে নি বিএনপি।
এদিকে দ্বন্দ্ব চলছে খোদ খালেদা জিয়া ও প্রেস উইংয়েও।
কেন্দ্রীয় বিএনপিতে এমন অরাজকতার সুযোগে বিএনপির বিকল্প প্লাটফর্ম হিসাবে একটি ফোরাম তৈরির চেষ্টা করছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব মরহুম ওবায়দুর রহমানের স্ত্রী শাহেদা ওবায়েদ। তিনি এরই মধ্যে নাগরিক ঐক্য মঞ্চ নামে একটি সংগঠনকে দাঁড় করানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
বিএনপিতে অবহেলিত ও বঞ্চিতদের নিয়ে বিকল্প শক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।
বিএনপি থেকে চলে যাওয়া নেতাদের এক মঞ্চে আনার চেষ্টা চালাচ্ছেন বিএনপি থেকে পদত্যাগ করা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাও।
এ ব্যাপারে তিনি বলেন, “আমরা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলছি। তবে এই মুহূর্তেই নতুন রাজনৈতিক দল নয়। কারণ আমার উপর বিভিন্ন মহলের চাপ আছে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার ও ড. আবদুল মইন খান এ ব্যাপারে কোন কথা বলতে চাননি।
তবে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত আশরাফ হোসেন বলেন, “কতো কিছু হবে। সামনে আরও অনেক কিছু দেখতে পাবেন।”
তবে কি হতে পারে তা খোলাসা করেননি তিনি।











