0

বিশ্বব্যাংকের ঋণ বাতিলের বিষয়টি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করেছে : হোসেন জিল্লুর রহমান

>>>>>পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংক ঋণ প্রত্যাহার করে নেয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়াও এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ, পরিকল্পনাবিদ থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ বেশ সরগরম হয়ে উঠছেন। অন্যদিকে মহাজোট সরকার বলছে তদন্ত শেষ করার আগেই দুর্নীতির অভিযোগ গ্রহনযোগ্য নয়। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ তারা দুর্নীতির ব্যাপারে সরকারকে অবহিত করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

এতকিছুর পর সরকার বলছে পদ্মা সেতু হবে। বিরোধীদলের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নিয়েই পদ্মা সেতু নির্মাণে ফের আলোচনা শুরুর পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এমন তাগিদ এসেছে সরকার সমর্থিত বুদ্ধিজীবীদের। তারা আশা করছেন ইতিবাচক সিদ্ধান্তে সরকারের ওপর ফের আস্থা ফিরে আসবে। সরকার বলছে তারা বিকল্প পথে পদ্মা সেতু নির্মাণ করবেন। তার খরচও অনেক কম হবে।

আশঙ্কা এখানেই। মালয়েশিয়া বিনিয়োগ করলে পদ্মা সেতু নির্মাণে  যে খরচ হবে তা কিভাবে উসুল করবে দেশটি। এক্ষেত্রে কোনো শর্ত খোলাসা করতে চাচ্ছে না সরকার। সংসদে এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। পদ্মা সেতু প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির ‘বিশ্বাসযোগ্য’ প্রমাণ মিলেছে। বিশ্বব্যাংকের এ দাবি নিয়ে সংসদে অর্থমন্ত্রী একটি বিবৃতি দিয়েছেন।

আরেক আশঙ্কা বিশ্বব্যাংকের ঋণ বাতিলকে সমর্থন করেছে এডিবি। এডিবির মত অন্যান্য দাতা গোষ্ঠী যদি একই পথ অনুসরণ করে তাহলে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে বিকল্প কোন পথে আগাবে বাংলাদেশ। এনিয়ে সরকার, বিরোধীদল, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে কর্মকৌশল নির্ধারণের কোনো আলামত এখনো দেখা যাচ্ছে না। অন্ধ হলে যেমন প্রলয় বন্ধ থাকে না তেমনি দোষারপের রাজনীতির খপ্পরে জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হলে তার দায় কেউ এড়াতে পারে না।

কিন্তু এ জন্যে আহবান জানতে হবে সরকারকেই। সরকারের মনোভাব পরিবর্তনের কথা বলছেন অনেকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, অর্থনীতিবিদ ও গবেষক হোসেন জিল্লুর রহমান তাই মনে করছেন। বিষয়টি নিয়ে  আমাদের সাথে সাক্ষাতকারে মাঠ পর্যায়ে দারিদ্র বিমোচনের এই গবেষক মনে করেন, বিশ্বব্যাংকের ঋণ বাতিলের বিষয়টি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করেছে। তার নিজের লেখা রিথিংকিং রুরাল প্রোভার্টি: বাংলাদেশ এ্যাস এ কেস স্টাডি বইটিতে তিনি যেমন  এ বিষয়ে চিন্তার পুনর্মূল্যায়ণের কথা বলেছেন, তেমনি পদ্মা সেতু নির্মাণে জটিলতা নিরসনে যার যা ভূমিকা তা পুনর্পঠনের প্রয়োজনও বলছেন।

প্রশ্ন : বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণে ঋণ বাতিল করার পর অবস্থান পরিবর্তন করেনি। তাহলে উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিকল্প ভাববার মত সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে কি না?

হোসেন জিল্লুর রহমান : সক্ষমতা অর্জন করেছে কিনা এটাতো একটা অভিমতের বিষয়, তাইনা। মানে সরকার বা অর্থমন্ত্রী বললেন। এটা হচ্ছে যে ফ্যাক্টস এ্যান্ড ফিগারের বিষয়। তো সেখানে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি যে আইএমএফ’এর ঋণটা যে আমাদের নিতে হল, কারণ আমাদের সামষ্ঠিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করা যাচ্ছিল না। তাইনা। এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার যে ঋণ নেয়া হল। অবশ্য আমাদের অর্থনীতির অনেক উন্নতি হয়েছে, কিন্তু বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের উদ্বৃত্ত অর্থ আছে কিনা, যা থেকে এখনি অর্থায়ন করতে পারব। সে প্রশ্নগুলোর উত্তর এত সহজে দেয়ার বিষয় নয়। সেখানে এখনো ওই পর্যায়ে সক্ষমতা অর্জন করিনি বলেই আমাদের এই ধরণের ঋণ ইত্যাদির কথা চিন্তা করতে হচ্ছে।

আরেকটা বিষয়, সক্ষমতার দুটি দিক। একটা হচ্ছে, আর্থিক ও অন্যটি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। যেমন আমাদের মানুষের কাছে হয়ত অর্থ আছে। সেটা ট্যাক করে হয়ত অর্থ আমরা তুলতে পারতাম। কিন্তু সেই অর্থ  অর্থাৎ মানুষের কাছ থেকে যদি আমরা বিনিয়োগের অর্থ তুলতে চাই, তা করতে হলে যে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের নজির স্থাপন করা দরকার, সেখানেও কিন্তু আমাদের সক্ষমতার ব্যাপক ঘাটতি রয়ে গেছে। সক্ষমতায় দুই ধরণের ঘাটতির কারণে আমাদের অর্থনীতি অনেক উন্নতি হওয়া সত্বেও এই বিনিয়োগগুলো এখনো নির্ভরশীল পর্যায়ে রয়ে যাচ্ছে। একটা হচ্ছে আর্থিক সক্ষমতা ও আরেকটি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা।

প্রশ্ন : বিশ্বব্যাংক ও এডিবি পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে, এখন এর ফলে আমাদের কি ধরণের অসুবিধা মোকাবেলা করতে হবে?

হোসেন জিল্লুর রহমান : দাতারাতো বাংলাদেশের সাথে কোনো সমস্যা করছে না। দাতা সংস্থা ও বিদেশি সম্প্রদায় বাংলাদেশকে দেশ হিসেবে তার সম্ভাবনা নিয়ে অর্থাৎ আমাদের অর্জন নিয়ে তারা খুবই প্রশংসা করে। এই মূহুর্তে আসলে সমস্যা হচ্ছে যারা দেশ পরিচালনায় আছেন, তাদের কর্মকাণ্ডে কিছু ঘাটতির জন্যেই এ সমস্যা হচ্ছে। বাংলাদেশকে নিয়ে কিন্তু সমস্যাটা নয়। সুতরাং যে ঘাটতিগুলো হচ্ছে দেশ পরিচালনায়, সেগুলোর দিকে একটু নজর দেয়া প্রয়োজন আরকি। সেগুলোতে যদি ঠিকমত নজর দেই, তাহলে আমরা এই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে তাদের যে আমাদের প্রতি জেনারেল গুডউইল আছে সেটা আমরা আবারো ব্যবহার করে আমরা আমাদের প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারব।

প্রশ্ন : প্রধান বিরোধীদল বিএনপির তরফ থেকে বলা হচ্ছে তারা ক্ষমতায় গেলে আবারো বিশ্বব্যাংকের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে দুটো পদ্মা সেতু বানাবে?

হোসেন জিল্লুর রহমান : বিএনপির কথা হচ্ছে যে, ওরা এখন এটা বলুক। কিন্তু কথা হচ্ছে যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়ে গেছে, সেগুলোতো মুখের কথায় পূরণ হয়ে যাবে না।  ওগুলো অর্জন করে দেখাতে হবে। তো সার্বিক বিষয়টা হচ্ছে যে আমরা বিনিয়োগের জন্যে যে অন্য জায়গা থেকে ঋণ নিচ্ছি, আমরাতো দান নিচ্ছি না, ঋণতো পৃথিবীর সবদেশই নিতে থাকে। চীনও নেয়। চীনতো পৃথিবীর এক নম্বর দেশ। সেখানেও তো তারা ঋণ নেয়। ঋণ নেয়াটা কোনো সমস্যা নয়, ঋণ নেয়ার শর্তগুলো আমাদের অনুকূলে নিয়েছে কিনা, সেটাই হচ্ছে মূল কথা। এবং ঋণ নেয়ার বিষয়ে যে দরকষাকষি, সেগুলো আমরা দক্ষতার সাথে করতে পারছি কিনা। এইখানে আমাদের বড় ধরণের ঘাটতিগুলো হচ্ছে আরকি।

প্রশ্ন : সরকারতো দক্ষতার সাথে পদ্মা সেতুর জন্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণের চেয়ে কম খরচে বিকল্প বিনিয়োগের টাকা যোগাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের বাইরে বিকল্প চিন্তা করছে, কনসোর্টিয়াম হোক, কাল টাকা সাদা করে হোক ইত্যাদি। কিভাবে দেখছেন ব্যাপারটিকে?

হোসেন জিল্লুর রহমান : বিবেচনা হচ্ছে, এধরণের খুব ‘লুজ’ কথাবার্তা দিয়েতো দক্ষতা অর্জন হয় না। আমরা ঘোষণা দিলাম যে আমরা পদ্মা সেতু করব বা করতে পারব। শুধু ঘোষণা দিয়ে এসব হয় না। তথ্য উপাত্ত দিয়েই মূল্যায়ণ করব। একজন বলল কি বলল না এটা দিয়েতো আর মূল্যায়ণ করা সম্ভব না। আলোচনাগুলো চায়ের টেবিলের পর্যায়ে করলে হবে না। এটা পরিচালনার বিষয়। দক্ষভাবে দরকষাকষির বিষয়। মালয়েশিয়া থেকে কি অর্থ পাব তার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ জরুরি। এখানে সুদের হার যদি বেশি হয়, তাহলে তা কিভাবে তোলা হবে। এগুলো আমাদের দক্ষতার সাথে আলোচনা করা উচিত। সেভাবে যদি আমরা আগাতে পারি তাহলে আমাদের দেশের জন্যে উপকার হবে।

প্রশ্ন : বিশ্বব্যাংকের এ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হবে কিনা?

হোসেন জিল্লুর রহমান : আমাদেরতো ভাবমূর্তির বড় ধরনের একটা সঙ্কট তৈরি হল। বটেই একটা বড় ধরণের সঙ্কট। এখন আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। কিন্তু এ উপলব্ধি হয় যে আমরা কোনো সঙ্কটে নেই, তাহলেতো সমস্যা। ভাবমূর্তির একটা বড় ধরণের সঙ্কট হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটা বড় ধরণের গুড উইল রয়েই গেছে, সুতরাং এ সঙ্কট আমরা যদি দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করি, এখনো তাহলে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।

তবে মূল দায়িত্ব সরকারের। বাইরের লোক হিসেবে গিয়ে এখানে করার কিছু নেই। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এগিয়ে যেতে হবে। আর যদি উপলব্ধি হয় যে কোনো সঙ্কট হয়নি, তাহল তা এক ধরণের পরিণতি, তাইনা। সরকারের ভেতর একটা উপলব্ধি আসা প্রয়োজন যে সমস্যা একটা হয়েছে। ভাবমূর্তি একটা ধাক্কা খেয়েছে। দক্ষতার সাথে পেশাদারিত্বের সাথে নির্মোহভাবে বিষয়টা বিশ্লেষণ করে সমাধানগুলো বের করার চেষ্টা করি। এই উপলব্ধি আসাটাই হচ্ছে এ মূহুর্তে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন।

About the Author

মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.

  • Bangla Radio 24

  • ফায়ারফক্সে স্বয়ংক্রীয় ক্রিকেট স্কোর দেখুন

  • বিজ্ঞাপন

  • সিলেট সংবাদ ডটকম

  • কোন বাঁধা মানবো না


  • ......................

  • ক্যালেন্ডার

  • 123 ...................... slide11
  • অনুসন্ধান-ক্যালেন্ডার

    জুলাই 2012
    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র
    « জুন   অগা »
     123456
    78910111213
    14151617181920
    21222324252627
    28293031  
  • Recent Comments

  • বিজ্ঞাপনের জন্য বরাদ্দ। আমাদের ওয়েব সাইটে বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে যোগাযোগ করুন। ইমেইল: sylhetsangbad24[@]gmail.com,

    >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 222222221
  • নচিকেতা-বৃদ্ধাশ্রম