সিলেটে ভয়াবহ বন্যা : শিশুর মুত্যু
>>> উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, সিলেট সদর ও কানাইঘাটে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সিলেট সদর ছাড়া বাকি চারটি উপজেলা সদরে বন্যার পানি উঠে গেছে। বন্ধ রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন পাঁচলাখ লোক।
জৈন্তাপুরে পানিতে ডুবে চার বছর বয়সী একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জে নিখোঁজ রয়েছে তিন শিশু।
ঢলের পানির তোড়ে বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জেলা দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি বৈঠক হয়েছে।
সুরমা, কুশিয়ারা, সারি, ধলাই ও পিয়াইন নদী দিয়ে ঢলের পানি নামা অব্যাহত রয়েছে। হাইড্রোলজি বিভাগ জানিয়েছেন, সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে এক দশমিক ৯৪ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর পানি জকিগঞ্জের অমলসিদ পয়েন্টে দশমিক চার সেন্টিমিটার ও বিয়ানীবাজারে শেওলা পয়েন্টে দশমিক ৩৩ সেন্টিমিটার বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কোম্পানীগঞ্জ থেকে সংবাদকর্মী আব্দুল আলীম জানান, সোমবার রাত তিনটার দিকে ধলাই নদী দিয়ে ভারত থেকে পানি নামতে শুরু করে। এক পর্যায়ে ঢলের পানি নদীর দুই তীর উপচে বিভিন্ন লোকালয়ে প্রবেশ করে।
ঢলের পানিতে কলাবাড়ি ও ঢালারপার গ্রাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কলাবাড়ি গ্রামের বেশ কয়েকটি বাড়ির পাশাপাশি কয়েকটি স্টোনক্রাশার মিল ও রাস্তা-ঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঢালারপার গ্রামের ২৫ থেকৈ ৩০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সিলেটের সঙ্গে কোম্পানীগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। উপজেলা কমপ্লেক্সের প্রতিটি কক্ষে পানি প্রবেশ করেছে।
কোম্পানীগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের নিয়ে নৌকাযোগে বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করেন।
উপজেলা চেয়ারম্যান এম তৈয়বুর রহমান জানান, তার উপজেলায় প্রায় ৫০ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে যে কোনো সময় কোম্পানীগঞ্জের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
গোয়াইনঘাট থেকে সাংবাদিক মনজুর আহমদ জানান, সিলেটের গোয়াইনঘাটে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। কয়েক সহস্রাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। উপজেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। উপজেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ভেসে গেছে গবাদি ও গৃহ পালিত পশু পাখি। ভেঙে গেছে কয়েক শতাধিক রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট। জাফলং ও বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারি দুইটি বন্ধ রয়েছে।
সোমবার ও মঙ্গলবারের টানা বর্ষণে আর ভারতের ডাউকি নদী দিয়ে পিয়ান নদীতে ঢল নামে এবং মাইন্ড্রু নদী দিয়ে সারি নদী হয়ে ঢল নামে। এতে উপজেলা সদরসহ সর্বত্র পানিতে তলিয়ে যায়।
উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম চৌধুরী ও গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখার আহমদ চৌধুরী ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
জৈন্তাপুর থেকে সংবাদদাতা জানান, সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা গত কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার সবকটি নদীর পানি বিপদসীমার ১৩ দশমিক ৫৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচেছ। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। যা এ বছরের সবচেয়ে বেশি।
অতি বর্ষণে গোখাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। আউশ- আমনের বীজতলা ও সাক-সবজির ক্ষেত তলিয়ে গেছে। বালু-পাথর কোয়ারি বন্ধ হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পরেছে।
জৈন্তাপুর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম পাহাড়ী ঢলে তলিয়ে গেছে। নিজপাট ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুল মালিক মানিক জানান, গোয়াবাড়ী, হরনী, বাইরাখেল, লক্ষীপ্রসাদ, রূপচেং, ম্যাগলিসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে রাস্তাঘাট ও বাড়ির উঠানে পানি উঠে পড়েছে। কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতি হয়েছে। গোয়া বাড়ী গ্রামের রাস্তা বড় গাং নদীর পানির স্রোতে ভেঙ্গে যান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে।
কানাইঘাট থেকে সংবাদদাতা জানান, উপজেলা সদরে ঢলের পানি প্রবেশ করেছে। উপজেলা সদর বাজারে কোমর সমান পানি। সুরমা ডাইকের অন্তত ৫০টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। খোলা হয়েছে দুইটি আশ্রয়কেন্দ্র।
উপজেলা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, ইউএনও সোহরাব হোসেন ও পৌর মেয়র লুৎফুর রহমান ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
সিলেট সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চলেও বন্যার পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে।
এ দিকে মঙ্গলবার বিকালে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি বৈঠক খান মোহাম্মদ বিলালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সকলকে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
সভায় চার উপজেলার জন্য ৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে গোয়াইনঘাট উপজেলায় ২০ টন, কানাইঘাটে ছয় টন, জৈন্তা ও কোম্পানীগঞ্জে ১২ টন করে চাল বরাদ্দ করা হয়।
জেলা প্রশাসক খান মোহাম্মদ বিলাল জানান, তারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন। পরিস্থিতি খারাপ হলে পরবর্তী করণীয় ঠিক করে রেখেছেন বলে তিনি জানান।











