0

এভারেস্টের সাথে “মেয়ে” নামক বাধার পাহাড়ও ডিঙ্গালো নিশাত

মুসা ইব্রাহিম যখন এভারেস্টের শৃঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালেন, তখন সবার অনুভূতি এমন ছিল যে, আমরাও পারি। এরপর মুহিত। আর এবার বাংলাদেশের একটা মেয়ে নিশাত মজুমদার। যে দেশে সকালে পত্রিকার পাতা উল্টালে নারীকে উত্ত্যক্ত করার খবর গিলতে হয়, এ্যাসিড ছুড়ে মারে কাপুরুষের দল, সেই দেশ থেকে একজন নারী এভারেষ্টকে পদদলিত করে চূড়ায় উঠলেন। এ অনুভূতি বাংলাদেশের মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবে দোলা না দিয়ে পারে না।

যে কোনো বাধা ডিঙ্গানোর চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের ছেলে মেয়েরা তাহলে নিতে জানে? এভারেস্টে আরোহণ নতুন কিছু নয়। মেয়ে হিসেবেও যদি ধরে নেই, জাপানের তামায়ে ওয়াতানাবে এই গেল শনিবার ৭৩ বছর বয়সে দ্বিতীয়বারের মত এভারেস্টে উঠলেন। আর সর্ব কনিষ্ঠ কিশোর যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ বছরের বালক জর্ডান রোমেরো ২০১০ সালে এভারেস্ট জয় করেন।

কিন্তু যে দেশে কোনো কিশোরী পেয়ারা বা আম পাড়তে গাছে উঠলে তীব্র বকুনি খেতে হয়, ছি: ছি: রব পড়ে যায় চারপাশে, মেয়েদের গাছে উঠতে নেই। ও মেয়ে গেছো তোর বিয়ে হবে না, সেই দেশের মেয়ে নিশাত উঠবে তো উঠল গিয়ে একেবারে এভারেস্টের শৃঙ্গে। স্বভাবতই নিশাতের এভারেস্ট আরোহণ তখন বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে সবার জন্যে। এ নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন অভিনেত্রী, নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচী।

প্রশ্ন:  নিশাত মজুমদার বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালেন এভারেষ্টে, কেমন আপনার অনুভূতি?

রোকেয়া প্রাচী: আমার নিজের জায়গা বা সাংস্কৃতিক অবস্থান থেকে নিশাত মজুমদারের এভারেষ্ট জয় অত্যন্ত গর্বের সাথে দেখছি। ও হয়ত ওখানে একা গিয়ে বাংলাদেশের পতাকাটা উড়িয়েছে, কিন্তু ওর সাথে পুরো বাংলাদেশটাই ওখানে গিয়েছে। বিশেষ করে নারী হিসেবে এটা আমাদের জন্যে অনেক মর্যাদার। এটা আমাদের সবার বিজয়। আমরা সবাই ওকে নিয়ে অনেক গর্বিত।

প্রশ্ন: মুসা ইব্রাহিমের আগে বাংলাদেশের একটা ছেলে কবে এভারেষ্ট বিজয় করবে অনেকে আমরা কল্পনা করতে পারতাম না। আর মেয়ে হিসেবে একটা অর্জনের ব্যাপার, প্রশিক্ষণ ও লক্ষ্য স্থির করে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপার এবং শেষ পর্যন্ত একটা  ব্যয়বহুল অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করেই ফেলল নিশাত। কিভাবে দেখছেন?

রোকেয়া প্রাচী: এ অভিযান অনেক কষ্টকর, কেননা নিশাত যে মেয়ে হিসেবে এভারেষ্ট জয় করল, তার পেছনে পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন পড়ে। বিশেষ করে বাংলাদেশে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অনেক বেশি সমর্থন প্রয়োজন। একটা মেয়েকে নিশাতের পর্যায়ে যেতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে, অনেক বেশি দূর এগিয়ে যেতে হয় তার। এবং তা একদিনে সম্ভব হয়নি। আমি বিশ্বাস করি অনেক মেয়ে আছে, আর সেরকম একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে । এসএসসির রেজাল্ট থেকে শুরু করে মেয়েরা অনেকদিকে এখন এগিয়ে আছে। মেয়েরা বিভিন্ন জায়গায় যেভাবে  কাজ করছে, তা খুব সফলতার সাথেই করছে। কাজেই নারীরা এখন আর শুধু নারী না, শক্তিশালী মানবসম্পদ হিসেবে তারা এখন নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে।

সেক্ষেত্রে নারীদের জন্যে সরকার ও সামাজিকভাবে প্রকৃত অর্থেই যদি নিরাপত্তা ও মর্যাদাকর একটা  পরিবেশ তৈরি করা যেত  এবং এইসব মেয়েরা যারা এ্যাডভেঞ্চারমূলক বা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছে দেশের জন্যে, সেইসব মেয়েদেরকে যদি আরো অনেক বেশি পৃষ্ঠপোষকতা দিতে এগিয়ে আসত সমাজ বা রাষ্ট্র তাহলে আমরা নিশাতের মত আরো অনেক মেয়েকে পাব। এবং নিশাতকে দেখে আমার বিশ্বাস যে অন্য মেয়েরা এগিয়ে আসবে। পত্রপত্রিকায় আমরা দেখি যে অনেক মেয়ে উত্যক্ত হয়ে সুইসাইড করছে বা নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, তারাও কিন্তু নতুন করে অনুপ্রেরণা পেত। যদি আমরা সেই পরিবেশটা তৈরি করতে পারি এবং আজকে আমরা নিশাতের বিজয়কে যদি সেই জায়গায় নিয়ে যেতে পারি, তাহলে আশা করি যে আমরা আগামি সময়গুলোতে এমন অনেক মেয়েকে পাব যারা আসলে শুধু মেয়ে না বাংলাদেশের প্রকৃত জনশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

প্রশ্ন:  মেয়েরা কিছু করতে চাইলে নিরাপত্তার কথা উঠে আসে, সেটা সামাজিক বা ঘরে কিংবা বাইরে, এটা কিভাবে নিশ্চিত করা যায়। বিশেষ করে মানুষ হিসেবে সমাজের অংশ হিসেবে এজন্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত একটা পরিবর্তন জরুরি কিনা? যেমন মেয়ে দেখলেই একটু বাঁকা করে তাকানো, এতে কি মেয়েরা এগিয়ে যেতে বাধা পায় না?

রোকেয়া প্রাচী: আমরা একটা মাইন্ডসেট তৈরি করে রেখেছি যে, ছেলে হলে বাবার সাথে বাজারে যেয়ে টাকাটা গুনতে পারে। আর মেয়ে হলে ঘরে থাকবে। বেশি বাইরে যাওয়া যাবে না। একা বেরুতে পারবে না। প্রথমেই বাবা মায়ের মধ্যে একটা মাইন্ডসেট থাকে। মা কিন্তু একটা নারী হয়ে প্রথমে তার ছেলে সন্তান ও মেয়ে সন্তানের মধ্যে আলাদা একটা বৈষম্য তৈরি করে ফেলে। এবং স্কুলে যখন যাচ্ছে শিক্ষা কারিকুলাম এমন করে বৈষম্য তৈরি করে দেয়, যে একটা মেয়েকে হোম ইকোনমিকস’এ খাবারের রেসিপি করতে হয়, ছেলেকে কৃষিবিজ্ঞানের আইটেম প্র্যাকটিকাল হিসেবে সাবমিট করতে হয়। এই জিনিষগুলো সোসাইটিতে পরবর্তীকালে প্রভাব পড়ে। ছেলে যখন ডাইনিং টেবিল থেকেই বোনকে দেখে নারী, আর ক্লাসরুমে দেখে খাবারের রেসিপি করছে, তখন থেকেই সে তার সহপাঠীকে নারী হিসেবে দেখতে শুরু করে। আমাদের আসলে পরিবার থেকে শুরু করে বিদ্যালয় পর্যন্ত  এবং কর্পোরেট অফিস, আদালত বা অন্যান্য জায়গায় এই মাইন্ডসেটকে ভাঙ্গতে হবে। সেখানে পরিবারের মা বাবাকে আসলে অনেক বেশি এগিয়ে আসতে হবে। ছেলে ও মেয়েকে বুঝাতে হবে তোমরা দুজনই আমাদের সন্তান। দুজনই মানুষ। এই মানুষের মধ্যে যোগ্যতার জায়গায়, মেধার জায়গায় কোনো পার্থক্য নেই। হয়ত জেন্ডারের জায়গায় তোমরা আলাদা।

প্রশ্ন:  তাহলে এজন্যেতো প্রস্তুতির দরকার আছে তাইনা? ঘুরে ফিরে সব দোষ দেখা যায় মেয়েটির ঘাড়ে গিয়ে পড়ে, কেনো এমন হয়? এ থেকে কিভাবে বের হয়ে আসা যায়?

রোকেয়া প্রাচী: বাবা মাকে কাউন্সিলিংটা যদি করা যায়, বিদ্যালয়ের পাঠে যদি এই জেন্ডারের বৈষম্য থেকে বের হয়ে আসতে পারি। আমার মনে হয় সে মাইন্ডসেটটা ভাঙ্গবে। এবং সবক্ষেত্রেই একটা মেয়ে যখন উত্যক্ত হয় বা নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে বা যখন ডিভোর্স হয় তখন কিন্তু আমরা বলি আসলে ওই পারল না। আমরা কিন্তু একটা ডিভোর্সি মেয়েকে অনেক কটাক্ষ করি। আমরা ধরেই নেই যে ডিভোর্সি বা মেয়েরা উত্যক্ত হচ্ছে তারই দোষ। এবং একটা মেয়ে কেনো রেখে ঢেকে চলল না। আমাদের এসব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বুঝতে হবে পৃথিবী এগিয়ে গেছে। এগিয়ে যাওয়া পৃথিবীর সাথে তাল মেলাতে হলে আমাদের এই বৈষম্যের জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমরা আমাদের মানসিকতাকে একটা জায়গায় ফিক্সড করে ফেলেছি। সেখান থেকে মুক্ত হতে হবে।

আর মুক্ত হতে হলে নিজেদের যেমন সচেতন হতে হবে , রাষ্ট্রকেও প্রশাসনিকভাবে সেই নিরাপত্তা দিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। কারণ একটি মেয়ে যখন উত্যক্ত হয়, একটি পরিবার যখন অনিশ্চয়তায় ভোগে তখন প্রশাসনিকভাবে রাষ্ট্রের কাছ থেকে যদি প্রকৃত অর্থেই সাপোর্টটা পায়, তাহলে বাবা মা তখন মেয়ের পক্ষ নিয়ে প্রতিবাদ করতে শিখবে। একটা মেয়ে কিন্তু তখন উত্যক্ত হলে বা নির্যাতনের কারণে রুখে দাঁড়াবে। রুখে দাঁড়ানোর পরিস্থিতি যেদিন তৈরি হবে আমাদের দেশে তখন নারীরা আর অবলার জায়গায় থাকবে না। ধরেন আজকে আমাকে একটা ছেলে উত্যক্ত করে পার পাবে না, কিন্তু একটা সাধারণ মেয়েকে উত্যক্ত করে কিন্তু পার পেয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মেয়েটার জন্যে যদি আইন বা প্রশাসন এগিয়ে আসে আর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিগুলো যদি হয়, তখন এই জায়গাগুলো থেকে আমরা বের হতে পারব।

আমাদের দেশে মেয়েরা কিন্তু আর মেয়ে নেই। মেয়েরা প্রকৃত অর্থেই শক্তিশালী জনগোষ্ঠী। তারা যেভাবে এগিয়ে আসছে, সবক্ষেত্রে প্রমাণ করেছে যোগ্যতা দিয়ে। তো সেই যোগ্যতা দিয়ে, প্রমাণ দিয়ে এগিয়ে আসা একটা সংখ্যাগরীষ্ঠ জনশক্তিকে  আরো বেশি পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে রাষ্ট্রের। নারী নীতি থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রকে  আরো একটু ভাবতে হবে। এই সংস্কারগুলোর প্রয়োজন আছে।

প্রশ্ন:  পাছে লোকে কিছু বলে, এরকম একটা বোধ পরিবার থেকে কিভাবে দূর করা যায়। যেখানে অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। একেবারে ডান হাত বাম হাতের মত। একটিকে বাদ দিয়ে চলা সম্ভব নয়। অঘোষিত একটা বেড়াজাল এটা দূর করতে কোনো বিশেষ শিক্ষা বা কি সহায়ক হতে পারে?

রোকেয়া প্রাচী: নারীরা ভোট  না দিলে সংসদীয় সরকার হবে না। আমাদের শিক্ষা কারিকুলামটাকে বদলাতেই হবে। এটা খুবই জরুরি। স্কুল পর্যায়ে যে শিক্ষা কারিকুলাম আছে সেখানে অনেক বেশি বৈষম্যহীন সিলেবাস করতে হবে এবং বাবা মা’র পাশাপাশি শিক্ষকদেরও সেই মানসিকতায় তৈরি হতে হবে, যে আমি যাদেরকে পড়াচ্ছি তারা উভয় আমার স্টুডেন্ট। এখানে নারী স্টুডেন্ট বা পুরুষ স্টুডেন্ট বা ছেলে মেয়ে এভাবে ভাবা যাবে না। মানুষতো শেখে আসলে বিদ্যালয়ের বয়স পর্যন্ত। সেই বয়সেই যদি  বৈষম্যহীন একটা শিক্ষা তারা পায়, তাহলে পরবর্তীকালে সেই ছেলেটি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে তখন কিন্তু সে তার সহপাঠীকে নারী হিসেবে দেখবে না, মানুষ হিসেবেই দেখবে।

প্রশ্ন: নিশাতের এভারেষ্ট জয়টা, মেয়েদের বাধার পাহাড় ডিঙ্গানোর প্রতীক হয়ে উঠবে কিনা?

রোকেয়া প্রাচী: অবশ্যই। আমি মনে করি এটা সকল মেয়েকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসা বা সকল বিপর্যস্ত বা সকল পরাজিত নারীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, যে নারী স্বপ্ন দেখে না তাকে স্বপ্ন দেখানো, বরঞ্চ এভাবে আরো বলা যায় যে, পুরো বাংলাদেশ আজকের যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অবক্ষয় এ সবকিছুর মধ্যে যেখানে সর্ব্বোচ্চ চালানের ইয়াবা ধরা পড়ে, এরকম একটি রাষ্ট্রে আজকের সবচেয়ে সুখকর সংবাদ হচ্ছে, নিশাত নামের একটি মেয়ে এভারেস্ট জয় করেছে। আমি মনে করি একই জয় থেকেই কিন্তু বাংলাদেশ  আজকের এই মুহূর্ত থেকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারে, এদেশ এগিয়ে যাবে। এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের প্রজম্ম অনেকখানি এগিয়ে গেছে, এখন তাদের এই এগিয়ে যাওয়ার সাথে রাষ্ট্রকে এগিয়ে যাওয়ার যাত্রা শুরু করতে হবে। এই মুহূর্ত থেকে আমরা সেই স্বপ্ন দেখতে পারি।

About the Author

মন্তব্য দিন

You must be logged in to post a comment.

  • Bangla Radio 24

  • ফায়ারফক্সে স্বয়ংক্রীয় ক্রিকেট স্কোর দেখুন

  • বিজ্ঞাপন

  • সিলেট সংবাদ ডটকম

  • কোন বাঁধা মানবো না


  • ......................

  • ক্যালেন্ডার

  • 123 ...................... slide11
  • অনুসন্ধান-ক্যালেন্ডার

    মে 2012
    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র
    « এপ্রি   জুন »
     1234
    567891011
    12131415161718
    19202122232425
    262728293031  
  • Recent Comments

  • বিজ্ঞাপনের জন্য বরাদ্দ। আমাদের ওয়েব সাইটে বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে যোগাযোগ করুন। ইমেইল: sylhetsangbad24[@]gmail.com,

    >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 222222221
  • নচিকেতা-বৃদ্ধাশ্রম