‘দলগুলোর অনমনীয় মনোভাব আরেকটা ওয়ান-ইলেভেনের জন্ম দিতে পারে’
ড. বদিউল আলম মজুমদার হলেন সুশাসনের জন্য নাগরিক(সুজন) সম্পাদক। ইনিউজবিডি টোয়েন্টি ফোর ডটকমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি পঞ্চদশ সংশোধনী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে নিজস্ব মতামত, বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাজমুস সাকিব আকাশ ও ফারজানা মায়া
ইনিউজ: : আ.লীগের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের চাপে তৎকালীন বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। সেই আ.লীগই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাদ দিয়েছে। এটাকে কিভাবে দেখছেন?
বদিউল আলম মজুমদার: তড়িঘড়ি করে পাস করা ১৫তম সংশোধনীর প্রভাব বিধ্বংসীই হবে। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের পুরো চরিত্রই বদলে দেয়া হয়েছে। এবং অনেকগুলো বিধানই সেখানে যুক্ত করা হয়েছে যা নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকারের প্রতি চরম হুমকিস্বরূপ। যেমন ৭(ক) অনুচেছদ বাক-স্বাধীনতার জন্য চরম হুমকি। তাছাড়াও সংবিধানের ৭(খ) অনুচ্ছেদে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অনুচ্ছেদকে ‘সংশোধনের অযোগ্য’ ঘোষণা করা হয়েছে। সংবিধানের এক-তৃতীয়াংশ কখনো ‘মৌলিক কাঠামো’ হতে পারে না; এবং এর মাধ্যমে সংসদ ও আদালতের এখতিয়ার সংকীর্ণ করা হলো। যদিও আমার মনে হয় উচ্চ আদালত যদি বলিষ্ঠ, সাহসী এবং নিরপেক্ষ হয় তবে এ সংশোধনীকে নিমিষেই ‘অসাংবিধানিক ও অবৈধ’ ঘোষণা করতে পারে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হলো- তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল, যেটা আমাদের ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে একরকম অনিশ্চিত করে দিয়েছে। আর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন যদি না হয় তাহলে কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শুধু অকার্যকরই নয়, রইল না। কারণ নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের প্রথম পদক্ষেপ। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে- তত্ত্বাবধায়ক সরকার দলীয় লোকদের সরিয়ে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের পদায়ন করে। নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে তারা কমিশনকে সহযোগিতা করে। তাই তত্ত্বাবধায়ক হোক বা অন্য নামেই হোক নির্বাচনকালীন একটা নিরপেক্ষ সরকার থাকতেই হবে ।
ওই সংশোধনী অনুযায়ী- সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩ মাস আগেই নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বিরাট হুমকি। কারণ সংসদ সদস্যরা এমনিতেই বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটায়- বিশেষত স্থানীয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর। তার উপর প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে চরম দলীয়করণ। প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর অসদাচারণের পরিবর্তন না হলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা দূরুহ। নির্বাচন কমিশন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও তাদের মনোনীত প্রার্থীরা সমন্বিতভাবে ও সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করলেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রত্যাশা করা সম্ভব।
ইনিউজ: তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা না রাখার যুক্তিতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- এ ব্যবস্থায় অনির্বাচিতরা ক্ষমতায় আসে যা গণতন্ত্রের প্রতিবন্ধক। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী তো এক-দশমাংশ অনির্বাচিত মন্ত্রী নিয়োগ দেয়ার সুযোগ রয়েছে; এবং সরকারের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে ট্যাকনোক্রেট মন্ত্রী।
বদিউল আলম মজুমদার: হ্যাঁ, তার বক্তব্যের সাথে কাজের বিরোধ আমরা লক্ষ্য করছি। যদি অনির্বাচিত ব্যক্তিরা এলেই গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কেন আন্দোলন করলেন? মূলত মাগুরার উপনির্বাচন কেন্দ্র করে আ.লীগের নেতৃত্বে চরম আন্দোলনের মুখে এ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল। তখন তো আপনারা গণতন্ত্রকে মুমূর্ষু অবস্থা থেকে উদ্ধার করার দাবি করেছিলেন।
মন্ত্রীদের কথা বাদই দিলাম। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচিত ব্যক্তিদের বসানোর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, জেলা পরিষদ সব জায়গায় তো সরকারি কর্মকর্তা যারা কিনা অনির্বাচিত। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের উদ্দেশ্যে গঠিত সার্চ কমিটিতে নির্বাচিত কেউ ছিল না। আর বর্তমান নিয়োগপ্রাপ্ত কমিশনারদের কেউ নির্বাচিত না।
ইনিউজ: আ.লীগের ভাষ্য- সুপ্রিম কোর্ট ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করায় সরকার বাধ্য হয়ে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাদ দিয়েছে। অন্যদিকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন সংসদ আদালতের রায় মানতে বাধ্য নয়। এ সম্বন্ধে আপনার মন্তব্য কী?
বদিউল আলম মজুমদার: রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ- আইন , নির্বাহী ও বিচার বিভাগ। এরা কেউ কারো উপরে নয় এবং তাদের আন্তঃসহযোগিতার মাধ্যমেই রাষ্ট্রের কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়। অবশ্য হাইয়ারার্কি করলে জনগণের প্রতিনিধি হেতু সংসদের পজিশন নাম্বার ওয়ান । রায়ে কোনো ঘাটতি থাকলে আইন করার সময় সংসদ তা সংশোধন করতে পারে। কিন্তু ডিফাই বা অমান্য করতে পারে না সংবিধানের কোনো বিষয় জড়িত থাকলে। কারণ সংবিধান বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যাই ‘চূড়ান্ত’।
ইনিউজ: আপিল বিভাগ সংক্ষিপ্ত আদেশে বলেছিল, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা আরো দুই টার্ম রাখা যাবে। কিন্তু তা পালন করা হয়নি। এতে আদালত অবমাননা হবে কিনা?
বদিউল আলম মজুমদার: না, আদালত অবমাননা হয়নি; কারণ ‘বল সংসদের কোর্টে’। ওই আদেশে এটাও বলা হয়েছিল যে, জনস্বার্থই সর্বোচ্চ আইন। আর বাংলাদেশ সংবিধান তো জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। তার উপর তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা রাখার পক্ষে পূর্বে সুপ্রিম কোর্টে দুটো রায় হয়েছে। এছাড়াও ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার অ্যামিকাস কিউরিদের মধ্যে একজন ছাড়া সবাই বলেছে এটা রাখতে। তাছাড়াও সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যাদের মতামত নেয়া হয়েছিল বেশিরভাগই এর পক্ষে বলেছে। তাই সংসদ চাইলে আবার সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল করতে পারে।
ইনিউজ: শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের পূবশর্ত। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সংসদকে আইন প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে। কিন্তু আইন না করে ‘সার্চ কমিটি’ গঠন দ্বারা সংবিধান লংঘন হয়েছে কিনা?
বদিউল আলম মজুমদার: সংবিধান লংঘন হয়েছে আমি বলব না, উপেক্ষা করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেছেন প্রজ্ঞাপন জারিও আইন। আইনের উদ্দেশ্য হলো, ইহা যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণ করে। কিন্তু প্রজ্ঞাপনে তা উল্লেখ থাকে না। ফলে সার্চ কমিটির মর্জির উপর নির্ভর করে কে নিয়োগপ্রাপ্ত হচ্ছেন। সুতরাং ঘোল দিয়ে যেমন দুধের স্বাদ মিটে না, প্রজ্ঞাপন জারি করেও আইনের কাজ সমাধা হয় না।
তাই ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো প্রশ্ন না ওঠে সেজন্য আইন প্রণয়ন করা অতীব জরুরি। এক্ষেত্রে বিগত নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতকৃত আইনের খসড়াটি সহায়ক হবে।
ইনিউজ: তত্ত্বাবধায়ক ফিরিয়ে আনা আ.লীগের জন্য ‘আত্মঘাতী’। অন্যদিকে বিএনপি তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন করতে অনড়। এমতাবস্থায় দেশের জন্য মঙ্গলজনক ব্যবস্থা কী হতে পারে?
বদিউল আলম মজুমদার: ব্যতিক্রমও হতে পারে। ক্ষমতাসীন দল আপোষের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি সংবিধানে ফিরিয়ে এনে বাহ্বা কুড়াতে পারে। কিন্তু সমস্যাটা হলো- কে হবে এ সরকারের প্রধান?
ওয়ান-ইলেভেন এসেছিল- কারণ, রাজনৈতিক দলগুলোর অনমনীয়তার কারণে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। পলিটিক্স ইজ দ্য আর্ট অব কম্প্রোমাইজ, এর ব্যাত্যয় ঘটলে তা অপরাজনীতি। শূণ্যস্থান তো পূরণ করতেই হবে, তাই যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ব্যাপারে আমার ফর্মুলা- পূর্বের সকল প্রধান বিচারপতিদের সমন্বয়ে একটা বোর্ড হবে এবং সভাপতি হবেন যিনি বয়োজ্যেষ্ঠ। তারাই সিদ্ধান্ত নিবেন কে হবে নিরপেক্ষ সরকারের প্রধান। এর জন্য আবার সংবিধান সংশোধনের দরকার হবে।
ইনিউজ: আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।
বদিউল আলম মজুমদার: আপনাদেরও ধন্যবাদ।











